শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। একজন শিক্ষক শুধু পড়ান না, তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন গড়েন। কিন্তু শিক্ষকরা কি সবসময় প্রস্তুত থাকেন? আধুনিক যুগে শিক্ষাদানের পদ্ধতি পাল্টেছে। প্রযুক্তি এসেছে শ্রেণিকক্ষে। তাই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এখন অপরিহার্য। এই নিবন্ধে আমরা জানব কীভাবে শিক্ষকরা নিজেদের দক্ষ করতে পারেন। কেন প্রশিক্ষণ জরুরি এবং কোথায় পাওয়া যায় সেই সুযোগ। চলুন শুরু করা যাক।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক ক্লাসে ভালো পড়াতে পারেন। তিনি জানেন কীভাবে ছাত্রদের মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষক হয়তো পুরনো পদ্ধতিতেই আটকে থাকেন। কিন্তু সময় বদলেছে, পাঠ্যক্রম বদলেছে। তাই শিক্ষকদেরও বদলাতে হবে। প্রশিক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তারা নতুন কৌশল শেখেন। শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল পান। এভাবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হয়। একটি দেশের উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ
প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা এই স্তরেই প্রথম শিক্ষা পায়। ছোট বাচ্চাদের পড়ানো সহজ নয়। তাদের মন দ্রুত অন্যদিকে চলে যায়। তাই শিক্ষকদের বিশেষ কৌশল জানতে হয়। প্রশিক্ষণে শেখানো হয় খেলার ছলে পড়ানো। ছবি, গান, গল্প দিয়ে পাঠদান। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকদের ধৈর্য থাকতে হয়। তাদের শিশু মনোবিজ্ঞান বুঝতে হয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আছে। সেখানে নতুন শিক্ষকরা ১৮ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স করেন। এই কোর্সে থাকে শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা। থাকে শিশুদের মূল্যায়ন পদ্ধতি।
মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ
মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত। কারণ এই স্তরে বিষয়ভিত্তিক পড়ানো হয়। একজন গণিত শিক্ষক শুধু গণিত পড়ান। বিজ্ঞান শিক্ষক পড়ান পদার্থ বা রসায়ন। তাই প্রশিক্ষণও হয় বিষয়ভিত্তিক। শিক্ষকদের জানতে হয় নতুন শিক্ষাক্রম। জানতে হয় মূল্যায়ন পদ্ধতি। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা একটু বড়। তাদের প্রশ্ন করার ক্ষমতা বেশি। তাই শিক্ষকদের আরও জ্ঞান রাখতে হয়। বাংলাদেশে NAPE (ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট) মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও এবং সরকারি প্রকল্প আছে। এসব জায়গায় শিক্ষকরা আধুনিক পদ্ধতি শেখেন।
প্রশিক্ষণের মূল উপাদান (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক):
- শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা: কীভাবে ক্লাসে শৃঙ্খলা রাখবেন
- পাঠ পরিকল্পনা: দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পরিকল্পনা তৈরি
- মূল্যায়ন কৌশল: শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে যাচাই করা
- মনোবিজ্ঞান: শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বোঝা
- প্রযুক্তি ব্যবহার: কম্পিউটার এবং ডিজিটাল টুলস
বাংলাদেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা
বাংলাদেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। সরকার এ বিষয়ে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক স্তরে আছে PTI বা প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। দেশের প্রতিটি জেলায় প্রায় PTI আছে। এখানে নতুন এবং পুরনো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মাধ্যমিক স্তরে আছে NAPE এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও কাজ করছে। ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা এরকম সংস্থা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়। সরকারি কর্মসূচির মধ্যে আছে SLIP, TQI-SEP। এসব প্রকল্পে হাজার হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণ পান। তবে এখনও অনেক শিক্ষক বাদ পড়ে যান।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স
শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স বিভিন্ন ধরনের হয়। কিছু কোর্স হয় স্বল্পমেয়াদী। যেমন ৫ দিন বা ১০ দিনের ওয়ার্কশপ। এসব কোর্সে একটি বিশেষ বিষয় শেখানো হয়। যেমন ডিজিটাল শিক্ষা বা নতুন কারিকুলাম। আবার কিছু কোর্স হয় দীর্ঘমেয়াদী। প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ১৮ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স। বিএড (ব্যাচেলর অফ এডুকেশন) হল আরেকটি বড় কোর্স। এটি এক বছরের। এমএড (মাস্টার অফ এডুকেশন) দুই বছরের কোর্স। এসব কোর্সে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার তত্ত্ব শেখেন। শেখেন বাস্তব প্রয়োগ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কোর্স চালু আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এরকম জায়গায়।
নতুন কারিকুলামে শিক্ষক প্রশিক্ষণ
নতুন কারিকুলামে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এখন খুব জরুরি। ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু হয়েছে। এই কারিকুলামে পরীক্ষার চেয়ে শিখন বেশি গুরুত্ব পায়। শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখে। প্রজেক্ট করে, উপস্থাপনা করে। পুরনো পদ্ধতিতে শিক্ষকরা শুধু বই পড়াতেন। এখন তাদের সহায়ক হতে হয়। তাই শিক্ষকদের নতুন প্রশিক্ষণ দরকার। NCTB (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) এজন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রতিটি স্কুলের শিক্ষকদের ডাকা হচ্ছে। তারা শিখছেন কীভাবে নতুন বইয়ে পড়াবেন। কীভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন।
নতুন কারিকুলামের প্রশিক্ষণের বিষয়:
- অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন: বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত করে শেখানো
- যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন: পরীক্ষার বদলে দক্ষতা যাচাই
- সহযোগিতামূলক শিক্ষা: দলগত কাজ এবং প্রজেক্ট
- সৃজনশীল চিন্তা: শিক্ষার্থীদের নিজে ভাবতে উৎসাহ দেওয়া
- মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষার্থীদের মন বুঝে সহায়তা
NCTB শিক্ষক প্রশিক্ষণ
NCTB শিক্ষক প্রশিক্ষণ বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড দেশের সব পাঠ্যবই তৈরি করে। তারাই নতুন কারিকুলাম ডিজাইন করেছে। এজন্য NCTB নিজেই শিক্ষক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। তারা মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করেছে। এই মাস্টার ট্রেইনাররা আবার অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন। এভাবে ক্যাসকেড মডেলে প্রশিক্ষণ চলছে। NCTB প্রশিক্ষণ সাধারণত ৩-৫ দিনের হয়। এতে শিক্ষকদের নতুন বই দেওয়া হয়। তারা শেখেন প্রতিটি অধ্যায় কীভাবে পড়াবেন। কী কী কার্যক্রম করাবেন। শিক্ষার্থীদের কীভাবে উৎসাহিত করবেন।
শিক্ষক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
শিক্ষক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দুটি আলাদা জিনিস। তবে দুটোই জরুরি। শিক্ষক শিক্ষা মানে হল একজন মানুষকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কেউ যদি শিক্ষক হতে চান তাহলে তিনি বিএড বা এমএড করেন। এগুলো শিক্ষক শিক্ষার অংশ। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ হল চাকরির সময় দক্ষতা বাড়ানো। একজন শিক্ষক যখন চাকরি করছেন তখন তিনি প্রশিক্ষণ নেন। এতে তিনি নতুন পদ্ধতি শেখেন। দুটো মিলেই একজন শিক্ষক সম্পূর্ণ হন। শিক্ষক শিক্ষা দেয় মূল ভিত্তি। প্রশিক্ষণ দেয় আধুনিক দক্ষতা। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষা চালু আছে।
শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ মানে হল শিক্ষকের পেশাগত যোগ্যতা বাড়ানো। একজন শিক্ষকের অনেক দক্ষতা লাগে। যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, শ্রোতা হওয়া, সমস্যা সমাধান। প্রযুক্তি ব্যবহার, সময় ব্যবস্থাপনা এসবও দক্ষতা। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে এসব শেখানো হয়। কীভাবে ভালো বক্তা হবেন। কীভাবে ছাত্রদের কথা শুনবেন। কীভাবে ক্লাসে সমস্যা সমাধান করবেন। এসব দক্ষতা একদিনে আসে না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ লাগে। তাই অনেক দেশে চলমান প্রশিক্ষণ আছে। বছরে দুই-তিন বার শিক্ষকদের ডাকা হয়। বাংলাদেশেও এরকম ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। ডিজিটাল দক্ষতা এখন সবচেয়ে জরুরি।
শিক্ষকদের মূল দক্ষতা:
- যোগাযোগ দক্ষতা: স্পষ্ট করে কথা বলা এবং শোনা
- প্রযুক্তি দক্ষতা: কম্পিউটার, প্রজেক্টর, অনলাইন টুলস
- সৃজনশীলতা: নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করা
- সমালোচনামূলক চিন্তা: সমস্যা বিশ্লেষণ করা
- সহানুভূতি: শিক্ষার্থীদের অনুভূতি বোঝা
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। একবার শিক্ষক হলেই শেষ নয়। সারাজীবন শিখতে হয়। পৃথিবী পাল্টাচ্ছে, শিক্ষাও পাল্টাচ্ছে। তাই শিক্ষকদেরও পাল্টাতে হয়। পেশাগত উন্নয়নে থাকে নতুন জ্ঞান অর্জন। থাকে কর্মশালায় অংশ নেওয়া। থাকে অন্য শিক্ষকদের থেকে শেখা। অনেক দেশে শিক্ষকদের একটি পোর্টফলিও থাকে। সেখানে তারা নিজের উন্নতি লেখেন। বাংলাদেশেও এরকম ব্যবস্থা আসছে। শিক্ষকরা যদি নিয়মিত উন্নয়ন করেন তাহলে তারা পদোন্নতি পান। তাদের বেতন বাড়ে। এটি তাদের উৎসাহিত করে। পেশাগত উন্নয়ন শুধু প্রশিক্ষণ নয়। এতে আছে নিজে পড়াশোনা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা শেয়ার করা।
শিক্ষকদের ট্রেনিং কোর্স
শিক্ষকদের ট্রেনিং কোর্স বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে PTI, NAPE, BANBEIS। বেসরকারি অনেক এনজিও আছে। ব্র্যাক তাদের স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়। আশা ফাউন্ডেশন, ক্যাম্পে সহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এছাড়া আছে অনলাইন প্লাটফর্ম। শিক্ষক বাতায়ন একটি সরকারি অনলাইন পোর্টাল। এখানে হাজারো শিক্ষা উপকরণ আছে। শিক্ষকরা এখান থেকে বিনামূল্যে শিখতে পারেন। ইউটিউবেও অনেক শিক্ষা চ্যানেল আছে। যেমন ১০ মিনিট স্কুল, খান একাডেমি বাংলা। শিক্ষকরা নিজে নিজেও শিখতে পারেন। ট্রেনিং কোর্সে সাধারণত সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এই সার্টিফিকেট চাকরিতে কাজে লাগে।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্যে পার্থক্য
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্যে পার্থক্য বুঝা জরুরি। শিক্ষা হল বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন। এটি দীর্ঘমেয়াদী। যেমন কেউ বিএ পাস করলে তিনি শিক্ষিত। শিক্ষায় থাকে তত্ত্ব, দর্শন, ইতিহাস। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ হল নির্দিষ্ট দক্ষতা শেখা। এটি স্বল্পমেয়াদী। যেমন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, গাড়ি চালানো প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণে হাতে-কলমে শেখানো হয়। শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। প্রশিক্ষণ মানুষকে কাজ করতে শেখায়। দুটোই দরকার। একজন শিক্ষক হতে চাইলে আগে শিক্ষা নিতে হয়। তারপর চাকরির সময় প্রশিক্ষণ নিতে হয়। শিক্ষা দেয় জ্ঞান, প্রশিক্ষণ দেয় দক্ষতা।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের তুলনা:
| বিষয় | শিক্ষা | প্রশিক্ষণ |
| সময় | দীর্ঘমেয়াদী | স্বল্পমেয়াদী |
| উদ্দেশ্য | সামগ্রিক জ্ঞান | নির্দিষ্ট দক্ষতা |
| পদ্ধতি | তত্ত্ব ও বই | বাস্তব অনুশীলন |
| ফলাফল | ডিগ্রি/সনদ | সার্টিফিকেট |
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কী
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কী এটা অনেকেই জানতে চান। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হল একটি পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা। এতে থাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য। থাকে সময়সূচি। থাকে প্রশিক্ষক এবং অংশগ্রহণকারী। একটি ভালো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রথমে চাহিদা নিরূপণ করা হয়। কী শেখানো দরকার তা বোঝা হয়। তারপর কার্যক্রম ডিজাইন করা হয়। বিষয়, পদ্ধতি, উপকরণ ঠিক করা হয়। তারপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শেষে মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষকরা কতটা শিখল তা যাচাই করা হয়। একটি ভালো কার্যক্রমে হাতে-কলমে শেখা থাকে। থাকে আলোচনা, দলীয় কাজ। শুধু বক্তৃতা হলে কাজ হয় না।
শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতা
শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতা দুটি ভিন্ন জিনিস। যোগ্যতা হল শিক্ষাগত ডিগ্রি। যেমন একজন প্রাথমিক শিক্ষকের এইচএসসি পাস থাকতে হয়। একজন মাধ্যমিক শিক্ষকের অনার্স লাগে। এগুলো যোগ্যতা। দক্ষতা হল কাজের ক্ষমতা। যেমন ভালো পড়ানো, ছাত্রদের বোঝা, সমস্যা সমাধান। যোগ্যতা ছাড়া চাকরি পাওয়া যায় না। কিন্তু দক্ষতা ছাড়া ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষক আছেন যারা ভালো পড়াতে পারেন না। আবার কম যোগ্যতার শিক্ষক অসাধারণ পড়ান। আসলে দুটোই দরকার। যোগ্যতা দিয়ে চাকরি, দক্ষতা দিয়ে সফলতা। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ মূলত দক্ষতা বাড়ায়।
শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এখন অপরিহার্য। করোনার পর থেকে অনলাইন ক্লাস বেড়েছে। জুম, গুগল মিট এসব টুলস ব্যবহার করতে হয়। অনেক শিক্ষক প্রথমে পারতেন না। তাদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে। এখন মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সবখানে। প্রজেক্টর, কম্পিউটার, স্মার্ট বোর্ড। এসব চালাতে শিক্ষকদের জানতে হয়। ডিজিটাল প্রশিক্ষণে শেখানো হয় পাওয়ারপয়েন্ট তৈরি। ভিডিও সম্পাদনা। শিক্ষা অ্যাপ ব্যবহার। গুগল ক্লাসরুম চালানো। শিক্ষক বাতায়নে কনটেন্ট আপলোড করা। সরকার এজন্য একসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম চালু করেছে। তারা শিক্ষকদের বিনামূল্যে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দেয়।
ডিজিটাল প্রশিক্ষণের বিষয়:
- অনলাইন প্লাটফর্ম: জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিমস
- কনটেন্ট তৈরি: পাওয়ারপয়েন্ট, ভিডিও, অ্যানিমেশন
- শিক্ষা অ্যাপ: কাহুট, কুইজলেট, ডুয়েলিঙ্গো
- অনলাইন মূল্যায়ন: গুগল ফর্ম, অনলাইন পরীক্ষা
- সোশ্যাল মিডিয়া: শিক্ষায় ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার
গণশিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষণ
গণশিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষণ মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য। এই অধিদপ্তর সাক্ষরতা কার্যক্রম চালায়। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের পড়তে শেখায়। এজন্য তাদের বিশেষ শিক্ষক লাগে। এই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয় গণশিক্ষা অধিদপ্তর। তারা শেখান কীভাবে বয়স্কদের পড়াবেন। বয়স্করা শিশুদের মতো নয়। তাদের অভিজ্ঞতা আছে। তারা দ্রুত শিখতে চান। তাই পদ্ধতিও আলাদা। গণশিক্ষা অধিদপ্তর কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার চালায়। সেখানে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ হয়। যেমন সেলাই, মাছ চাষ, কম্পিউটার। এসব প্রশিক্ষকদেরও তারা ট্রেনিং দেয়। তাদের প্রশিক্ষণ সাধারণত ৫-১০ দিনের হয়। এতে ব্যবহারিক দিক বেশি থাকে।
উপজেলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ
উপজেলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্থানীয় পর্যায়ে হয়। প্রতিটি উপজেলায় একটি শিক্ষা অফিস আছে। সেখানে উপজেলা শিক্ষা অফিসার থাকেন। তিনি স্থানীয় শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান করেন। উপজেলা পর্যায়ে মাসিক সভা হয়। সেখানে শিক্ষকরা একত্রিত হন। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। কোনো সমস্যা হলে সমাধান খোঁজেন। অনেক সময় বাইরে থেকে প্রশিক্ষক আসেন। তিনি একটি বিশেষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। উপজেলা প্রশিক্ষণের সুবিধা হল শিক্ষকদের দূরে যেতে হয় না। তারা নিজ এলাকাতেই শিখতে পারেন। খরচও কম হয়। তবে সীমাবদ্ধতা হল সম্পদের অভাব। অনেক উপজেলায় ভালো প্রশিক্ষক নেই। উপকরণ নেই। তবুও এই ব্যবস্থা অনেক কার্যকর।
বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ
বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ একটি নতুন ধারণা। এতে প্রশিক্ষণ হয় স্কুলেই। বাইরে যেতে হয় না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা অভিজ্ঞ শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ দেন। সপ্তাহে এক দিন সময় বের করা হয়। সব শিক্ষক বসেন। একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন কীভাবে গণিত মজার করে পড়ানো যায়। কীভাবে দুর্বল ছাত্রদের সাহায্য করা যায়। এই পদ্ধতির সুবিধা অনেক। খরচ নেই, সময় কম লাগে। শিক্ষকরা নিজেদের স্কুলের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। সমাধান খোঁজেন। তারা একে অপরের কাছ থেকে শেখেন। জাপান, সিঙ্গাপুরে এই পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও কিছু স্কুল শুরু করেছে। এটি লেসন স্টাডি নামেও পরিচিত।
শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণ এখন খুবই জনপ্রিয়। করোনার পর থেকে এটি বেড়েছে। অনলাইনে প্রশিক্ষণের অনেক সুবিধা। শিক্ষকরা ঘরে বসে শিখতে পারেন। তাদের স্কুল ছাড়তে হয় না। সময় বাঁচে, যাতায়াত খরচ বাঁচে। অনলাইনে অনেক কোর্স পাওয়া যায়। কোর্সেরা, ইউডেমি, এডএক্স এরকম প্লাটফর্ম। সেখানে হাজারো শিক্ষা কোর্স আছে। কিছু বিনামূল্যে, কিছু অল্প টাকায়। বাংলাদেশেও অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক বাতায়ন সরকারের একটি উদ্যোগ। এখানে শিক্ষকরা কনটেন্ট পান। ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখতে পারেন। তবে অনলাইনে সীমাবদ্ধতাও আছে। ইন্টারনেট লাগে। অনেক এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল। হাতে-কলমে শেখা কঠিন।
অনলাইন প্রশিক্ষণ প্লাটফর্ম:
- শিক্ষক বাতায়ন: সরকারি বাংলা প্লাটফর্ম
- কোর্সেরা: আন্তর্জাতিক বিনামূল্যে কোর্স
- এডএক্স: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোর্স
- ইউটিউব: বিনামূল্যে শিক্ষা ভিডিও
- জুম ওয়েবিনার: সরাসরি অনলাইন সেশন
শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে শিক্ষকদের উন্নত করতে হবে। একজন অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক ভালো পড়াতে পারেন না। তিনি পুরনো পদ্ধতিতে আটকে থাকেন। শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হয়। তারা শিখতে চায় না। ফলাফল খারাপ হয়। অন্যদিকে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নতুন পদ্ধতি জানেন। তিনি ক্লাস মজার করতে পারেন। শিক্ষার্থীরা উৎসাহিত হয়। তাদের ফলাফল ভালো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা ৩০% বেশি কার্যকর। তাই প্রতিটি দেশ শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশেরও এটি প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রশিক্ষণ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপকারিতা:
| উপকার | বিবরণ |
| শিক্ষার মান বৃদ্ধি | ভালো পাঠদান পদ্ধতি |
| শিক্ষার্থীর ফলাফল | পরীক্ষায় ভালো নম্বর |
| শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস | নিজের কাজে দক্ষতা |
| আধুনিক পদ্ধতি | প্রযুক্তি ব্যবহার |
শিক্ষক প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
শিক্ষক প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হওয়া চাই। প্রথম লক্ষ্য হল শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো। তারা যেন ভালোভাবে পড়াতে পারেন। দ্বিতীয় লক্ষ্য হল শিক্ষার মান উন্নত করা। ভালো শিক্ষক মানে ভালো শিক্ষা। তৃতীয় লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের উপকার করা। শেষ পর্যন্ত তারাই লাভবান হয়। উদ্দেশ্যের মধ্যে আছে আধুনিক পদ্ধতি শেখানো। প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো। শিশু মনোবিজ্ঞান বোঝানো। মূল্যায়ন পদ্ধতি শেখানো। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা শেখানো। এসব উদ্দেশ্য পূরণ হলে শিক্ষক সফল হন। তিনি আত্মবিশ্বাসী হন। স্কুল এবং সমাজে তার সম্মান বাড়ে। শিক্ষার্থীরাও তাকে ভালোবাসে।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা কী
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা কী এটি বোঝা জরুরি। পেশাগত দক্ষতা মানে হল চাকরিতে দরকারি যোগ্যতা। একজন শিক্ষকের অনেক পেশাগত দক্ষতা লাগে। প্রথমত বিষয় জ্ঞান। তিনি যা পড়ান তা ভালো জানতে হবে। দ্বিতীয়ত শিক্ষাদান কৌশল। কীভাবে সহজ করে বোঝাবেন। তৃতীয়ত যোগাযোগ দক্ষতা। স্পষ্ট করে কথা বলা। চতুর্থত শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা। শৃঙ্খলা রাখা। পঞ্চমত মূল্যায়ন দক্ষতা। ছাত্রদের সঠিকভাবে যাচাই করা। ষষ্ঠত প্রযুক্তি দক্ষতা। কম্পিউটার, প্রজেক্টর ব্যবহার। সপ্তমত সহানুভূতি। ছাত্রদের মন বোঝা। এসব দক্ষতা একসাথে একজন শিক্ষককে পরিপূর্ণ করে। প্রশিক্ষণে এসব দক্ষতা শেখানো হয়।
শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষক ভালো জানেন কিন্তু ক্লাস সামলাতে পারেন না। ৪০-৫০ জন ছাত্র একসাথে। সবাই কথা বলে, দুষ্টুমি করে। এই পরিস্থিতি সামলানো কঠিন। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি কৌশল আছে। প্রথমত নিয়ম-কানুন ঠিক করা। ছাত্রদের জানানো কী করা যাবে, কী যাবে না। দ্বিতীয়ত সময় ব্যবস্থাপনা। ক্লাসের সময় ভাগ করে নেওয়া। তৃতীয়ত শৃঙ্খলা রাখা। কিন্তু ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবেসে। চতুর্থত সবাইকে সুযোগ দেওয়া। দুর্বল ছাত্রদেরও। পঞ্চমত আকর্ষণীয় পাঠদান। বিরক্তিকর হলে ছাত্ররা অমনোযোগী হয়। প্রশিক্ষণে এসব শেখানো হয় রোল প্লে দিয়ে। শিক্ষকরা নিজেরা অভিনয় করেন।
শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার কৌশল:
- নিয়ম স্থাপন: প্রথম দিনেই নিয়ম জানানো
- ইতিবাচক পরিবেশ: ছাত্রদের উৎসাহিত করা
- সময় বিভাজন: প্রতিটি কাজে নির্দিষ্ট সময়
- সমস্যা সমাধান: দ্রুত এবং ন্যায্যভাবে
- আকর্ষণীয় পাঠ: মজার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষক উন্নয়ন
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষক উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকার বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে। SLIP (স্ট্রেনদেনিং লার্নিং ইম্প্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম) একটি বড় প্রকল্প। এতে হাজার হাজার মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। TQI-SEP (টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট) আরেকটি প্রকল্প। এখানে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ হয়। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি শিক্ষকদের আলাদা প্রশিক্ষণ। NAPE মাধ্যমিক শিক্ষকদের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ দেয়। প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী প্রধান শিক্ষকদের। তারা শেখেন কীভাবে স্কুল পরিচালনা করতে হয়। মাধ্যমিক শিক্ষক উন্নয়নে বেসরকারি খাতও কাজ করছে। ব্র্যাক, আশা, রুম টু রিড এরকম সংস্থা। তারা শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ মানে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ। যেমন গণিত শিক্ষকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ। বিজ্ঞান শিক্ষকদের জন্য আলাদা। প্রতিটি বিষয়ের পড়ানোর পদ্ধতি আলাদা। গণিতে সমস্যা সমাধান করাতে হয়। বিজ্ঞানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখাতে হয়। ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ দিতে হয়। বাংলায় সাহিত্য বোঝাতে হয়। তাই বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ জরুরি। এতে শিক্ষকরা নিজ বিষয়ে দক্ষ হন। তারা নতুন শিক্ষণ উপকরণ পান। জানেন কীভাবে কঠিন বিষয় সহজ করবেন। বাংলাদেশে NCTB এবং NAPE বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়। প্রতি বছর শত শত শিক্ষক অংশ নেন। এই প্রশিক্ষণ সাধারণত ৫-৭ দিনের হয়।
বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের উদাহরণ:
| বিষয় | প্রশিক্ষণের ফোকাস |
| গণিত | সমস্যা সমাধান কৌশল |
| বিজ্ঞান | পরীক্ষা-নিরীক্ষা পদ্ধতি |
| ইংরেজি | কথা বলা ও শোনা |
| বাংলা | সাহিত্য বিশ্লেষণ |
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ধাপ
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ধাপ জানা গুরুত্বপূর্ণ। একটি সফল প্রশিক্ষণ কয়েকটি ধাপে হয়। প্রথম ধাপ হল চাহিদা নিরূপণ। কী প্রশিক্ষণ দরকার তা বোঝা। শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করা। দ্বিতীয় ধাপ হল পরিকল্পনা। কী শেখানো হবে, কীভাবে শেখানো হবে তা ঠিক করা। তৃতীয় ধাপ হল প্রশিক্ষক নির্বাচন। অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশিক্ষক খোঁজা। চতুর্থ ধাপ হল প্রশিক্ষণ প্রদান। এখানে মূল শিক্ষা হয়। পঞ্চম ধাপ হল মূল্যায়ন। শিক্ষকরা কতটা শিখল তা যাচাই করা। ষষ্ঠ ধাপ হল ফলো-আপ। প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকরা কাজে লাগাচ্ছেন কিনা দেখা। এই ধাপগুলো মেনে চললে প্রশিক্ষণ সফল হয়।
শিক্ষকদের টিচিং মেথড ট্রেনিং
শিক্ষকদের টিচিং মেথড ট্রেনিং মানে পাঠদান পদ্ধতির প্রশিক্ষণ। বিভিন্ন পাঠদান পদ্ধতি আছে। যেমন বক্তৃতা পদ্ধতি। এতে শিক্ষক পড়ান, ছাত্ররা শোনে। এটি পুরনো পদ্ধতি। আরেকটি হল প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি। শিক্ষক প্রশ্ন করেন, ছাত্ররা উত্তর দেয়। এটি আরও ভালো। আরো আছে দলীয় কাজ পদ্ধতি। ছাত্ররা দল বেঁধে কাজ করে। এটি খুব কার্যকর। প্রজেক্ট পদ্ধতিতে ছাত্ররা নিজেরা কিছু তৈরি করে। এটি নতুন কারিকুলামে আছে। টিচিং মেথড ট্রেনিংয়ে এসব পদ্ধতি শেখানো হয়। শিক্ষকরা বোঝেন কোন পদ্ধতি কখন ব্যবহার করবেন। তারা নিজেরা অনুশীলন করেন। রোল প্লে করেন। এভাবে তারা দক্ষ হন।
শিক্ষকদের উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ হল চলমান শিক্ষা। এটি শুধু একবার নয়, বারবার হয়। একজন শিক্ষক চাকরিতে যোগ দেন। তিনি প্রথমে মৌলিক প্রশিক্ষণ পান। তারপর প্রতি বছর তিনি উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ পান। এতে নতুন নতুন বিষয় শেখানো হয়। যেমন এক বছর হয়তো ডিজিটাল শিক্ষা। আরেক বছর মূল্যায়ন পদ্ধতি। এভাবে শিক্ষকরা নিয়মিত আপডেট থাকেন। অনেক দেশে এটি বাধ্যতামূলক। শিক্ষকদের প্রতি বছর নির্দিষ্ট ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিতে হয়। না নিলে পদোন্নতি হয় না। বাংলাদেশেও এরকম নিয়ম আসছে। উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের উৎসাহিত রাখে। তারা অলস হয়ে যান না। নতুন কিছু শিখতে থাকেন।
উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের বিষয়:
- নতুন পাঠ্যক্রম: বছর বছর পরিবর্তন
- প্রযুক্তি আপডেট: নতুন সফটওয়্যার ও টুলস
- মূল্যায়ন পদ্ধতি: পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়ন
- মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষার্থীদের মানসিক সমর্থন
- বিশেষ চাহিদা: প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা
প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার পার্থক্য
প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার পার্থক্য জানা দরকার। দুটো আলাদা জিনিস। প্রশিক্ষণ হল দক্ষতা শেখা। এতে একজন প্রশিক্ষক থাকেন। তিনি শেখান। অংশগ্রহণকারীরা শেখেন। এটি কয়েক দিনের হয়। একটি নির্দিষ্ট বিষয় থাকে। শেষে মূল্যায়ন হয়। কর্মশালা হল আলোচনা করা। এতে সবাই সমান। প্রশিক্ষক নেই, ফ্যাসিলিটেটর থাকেন। তিনি শুধু আলোচনা পরিচালনা করেন। সবাই নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। একসাথে সমাধান খোঁজেন। কর্মশালা সাধারণত এক দিনের। এতে মূল্যায়ন কম থাকে। প্রশিক্ষণে শেখা বেশি, কর্মশালায় আলোচনা বেশি। দুটোই দরকার। প্রশিক্ষণ দেয় জ্ঞান, কর্মশালা দেয় ধারণা।
শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি

শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পুরনো পদ্ধতি থেকে আলাদা। আগে শুধু বক্তৃতা দেওয়া হতো। শিক্ষকরা বসে শুনতেন। এখন আর তা হয় না। আধুনিক পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ বেশি। শিক্ষকরা নিজেরা কাজ করেন। তারা দলে ভাগ হন। একটি সমস্যা দেওয়া হয়। তারা সমাধান খোঁজেন। রোল প্লে করেন। একে অপরকে পড়ান। ভিডিও দেখেন। আলোচনা করেন। এভাবে তারা শেখেন। আধুনিক প্রশিক্ষণে প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। পাওয়ারপয়েন্ট, ভিডিও, অ্যানিমেশন। থাকে হাতে-কলমে অনুশীলন। প্রশিক্ষকরা শুধু বলেন না, দেখান। শিক্ষকরা নিজেরা করেন। এই পদ্ধতি খুব কার্যকর। শিক্ষকরা বেশি শেখেন এবং মনে রাখেন।
আধুনিক প্রশিক্ষণ কৌশল:
| পদ্ধতি | বিবরণ |
| রোল প্লে | শিক্ষক হিসেবে অভিনয় |
| কেস স্টাডি | বাস্তব ঘটনা বিশ্লেষণ |
| দলীয় কাজ | একসাথে সমাধান খোঁজা |
| ডেমোনস্ট্রেশন | সরাসরি দেখানো |
উপসংহার
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। একটি দেশ উন্নত হয় শিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষা ভালো হয় শিক্ষকদের মাধ্যমে। তাই শিক্ষকদের দক্ষ করা সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থা মিলে কাজ করছে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক সব স্তরে প্রশিক্ষণ চলছে। নতুন কারিকুলাম এসেছে। শিক্ষকরা শিখছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসছে ক্লাসে। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকদেরও। প্রশিক্ষণের মান বাড়াতে হবে। শুধু সার্টিফিকেট নয়, আসল দক্ষতা দিতে হবে। নিয়মিত ফলো-আপ করতে হবে। শিক্ষকরা কাজে লাগাচ্ছেন কিনা দেখতে হবে। এভাবে চললে একদিন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বমানের হবে। শিক্ষকরা হবেন সবচেয়ে দক্ষ পেশাদার। শিক্ষার্থীরা পাবে মানসম্মত শিক্ষা। দেশ এগিয়ে যাবে উন্নতির পথে। তাই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ আসলে দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। এটি সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
শেষ কথা: শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ একটি চলমান যাত্রা। এটি কখনও শেষ হয় না। প্রতিটি শিক্ষক যদি নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেন, তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হবে। শিক্ষার্থীরা পাবে মানসম্মত শিক্ষা। দেশ এগিয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সবাই শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝি। শিক্ষকদের সম্মান করি। তাদের উন্নয়নে সহায়তা করি। কারণ তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়েন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQs)
শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন জরুরি?
শিক্ষক প্রশিক্ষণ জরুরি কারণ এটি শিক্ষার মান বাড়ায়। প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ান। তারা শিক্ষার্থীদের ভালো বোঝেন। ক্লাস হয় আকর্ষণীয়। শিক্ষার্থীরা বেশি শেখে। ফলাফল ভালো হয়। তাই প্রশিক্ষণ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোথায় পাওয়া যায়?
বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। সরকারি PTI, NAPE, BANBEIS প্রশিক্ষণ দেয়। বেসরকারি ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা দেয়। অনলাইনে শিক্ষক বাতায়ন আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিএড এবং এমএড কোর্স আছে। উপজেলা পর্যায়েও প্রশিক্ষণ হয়।
প্রাথমিক শিক্ষকদের কোন প্রশিক্ষণ লাগে?
প্রাথমিক শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ লাগে। PTI থেকে ১৮ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স। এতে শিশু মনোবিজ্ঞান শেখানো হয়। শেখানো হয় খেলার ছলে পড়ানো। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা। মূল্যায়ন পদ্ধতি। এছাড়া নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দরকার।
নতুন কারিকুলামে শিক্ষকদের কী শিখতে হয়?
নতুন কারিকুলামে শিক্ষকদের অনেক কিছু শিখতে হয়। শিখতে হয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা। কীভাবে প্রজেক্ট দেওয়া যায়। কীভাবে দলীয় কাজ করানো যায়। যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন কী। পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল করা। এসব নতুন দক্ষতা লাগে।
ডিজিটাল প্রশিক্ষণে কী শেখানো হয়?
ডিজিটাল প্রশিক্ষণে প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো হয়। কম্পিউটার চালানো। পাওয়ারপয়েন্ট তৈরি করা। জুম, গুগল মিট ব্যবহার। অনলাইন ক্লাস নেওয়া। শিক্ষা অ্যাপ ব্যবহার। ভিডিও তৈরি। গুগল ক্লাসরুম চালানো। শিক্ষক বাতায়নে কনটেন্ট আপলোড। এসব ডিজিটাল দক্ষতা।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ কত দিনের হয়?
শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিভিন্ন সময়ের হয়। স্বল্পমেয়াদী হয় ৩-৭ দিন। মাঝারি হয় ১০-১৫ দিন। দীর্ঘমেয়াদী হয় ১৮ মাস। বিএড এক বছর, এমএড দুই বছর। এটি নির্ভর করে কী প্রশিক্ষণ তার ওপর। মৌলিক প্রশিক্ষণ লম্বা। রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ ছোট।
প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা কি একই জিনিস?
না, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা এক নয়। প্রশিক্ষণে শেখানো হয়। একজন প্রশিক্ষক থাকেন। অংশগ্রহণকারীরা শেখেন। কর্মশালায় আলোচনা হয়। সবাই সমান। ফ্যাসিলিটেটর থাকেন। সবাই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। প্রশিক্ষণ দীর্ঘ, কর্মশালা সংক্ষিপ্ত। দুটোই দরকার।
অনলাইন প্রশিক্ষণ কি কার্যকর?
হ্যাঁ, অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যকর। এর অনেক সুবিধা। ঘরে বসে শেখা যায়। সময় বাঁচে। খরচ কম। যেকোনো সময় শেখা যায়। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। ইন্টারনেট লাগে। হাতে-কলমে শেখা কঠিন। মুখোমুখি যোগাযোগ নেই। তবুও অনলাইন প্রশিক্ষণ ভালো বিকল্প।
শিক্ষক প্রশিক্ষণে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় কি?
হ্যাঁ, বেশিরভাগ প্রশিক্ষণে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে একটি পরীক্ষা হয়। পাস করলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। এই সার্টিফিকেট চাকরিতে কাজে লাগে। পদোন্নতিতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখবেন, সার্টিফিকেট পাওয়া লক্ষ্য নয়। আসল লক্ষ্য হল দক্ষতা অর্জন।
শিক্ষকদের কত বছর পর পর প্রশিক্ষণ দরকার?
শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার। আদর্শভাবে প্রতি বছর। কমপক্ষে দুই-তিন বছর পর পর। নতুন পাঠ্যক্রম আসলে দরকার। নতুন প্রযুক্তি এলে দরকার। অনেক দেশে বছরে নির্দিষ্ট ঘণ্টা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও এরকম নিয়ম আসছে। চলমান প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের আপডেট রাখে।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍






