রাতের আকাশে তাকালে আমরা অসংখ্য নক্ষত্র দেখতে পাই। এই উজ্জ্বল বিন্দুগুলো আমাদের মনে নানা প্রশ্ন জাগায়। নক্ষত্র আসলে কী? কীভাবে তারা জন্ম নেয়? কেন তারা এত উজ্জ্বল? আজকের এই লেখায় আমরা নক্ষত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। সহজ ভাষায় বলব নক্ষত্রের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু।
নক্ষত্র কী
নক্ষত্র হলো মহাকাশের এক ধরনের জ্বলন্ত বস্তু। এরা নিজেরাই আলো তৈরি করে। গ্যাস ও ধুলো থেকে নক্ষত্র গঠিত হয়। নক্ষত্রের ভেতরে প্রচণ্ড তাপ থাকে। এই তাপ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলতে থাকে। আমাদের সূর্যও একটি নক্ষত্র। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। অন্য নক্ষত্রগুলো অনেক দূরে থাকে। তাই রাতে দেখলে তারা ছোট বিন্দুর মতো দেখায়। নক্ষত্র আসলে বিশাল আকারের গ্যাসের বল। এদের নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে। এই শক্তি তাদের একসাথে ধরে রাখে।
নক্ষত্র কিভাবে জন্মায়

নক্ষত্রের জন্ম হয় মহাকাশের গ্যাস ও ধুলো থেকে। এই মিশ্রণকে বলে নীহারিকা। নীহারিকার একটি অংশ ভারী হলে সংকুচিত হতে শুরু করে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সব কিছু টেনে নেয়। ক্রমশ চাপ ও তাপ বাড়তে থাকে। একসময় কেন্দ্রের তাপ কোটি ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তখন পরমাণু সংযোজন শুরু হয়। এভাবে একটি নতুন নক্ষত্র জন্ম নেয়। পুরো প্রক্রিয়া লক্ষ লক্ষ বছর সময় নেয়। একই নীহারিকা থেকে অনেক নক্ষত্র জন্মাতে পারে। আমাদের সূর্যও এভাবেই জন্মেছিল প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর আগে।
নক্ষত্র জন্মের ধাপ:
- নীহারিকা সংকুচিত হওয়া শুরু করে
- মাধ্যাকর্ষণ শক্তি গ্যাস ও ধুলো টানে
- কেন্দ্রে চাপ ও তাপ বাড়ে
- পরমাণু সংযোজন শুরু হয়
- নতুন নক্ষত্র আলো দিতে শুরু করে
নক্ষত্র কাকে বলে
যে মহাজাগতিক বস্তু নিজে থেকে আলো ও তাপ দেয় তাকে নক্ষত্র বলে। নক্ষত্র মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে তৈরি। এদের কেন্দ্রে পরমাণু সংযোজন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি বের হয়। সেই শক্তি আলো ও তাপ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। নক্ষত্র বিভিন্ন রঙের হতে পারে। লাল, হলুদ, নীল রঙের নক্ষত্র আছে। রং নির্ভর করে তাপমাত্রার ওপর। গরম নক্ষত্র নীল রঙের হয়। ঠান্ডা নক্ষত্র লাল রঙের হয়। আমাদের চোখে যত নক্ষত্র দেখি তার সবই আসলে সূর্যের মতো।
নক্ষত্র ও গ্রহের পার্থক্য
নক্ষত্র ও গ্রহ দুটোই মহাকাশের বস্তু। কিন্তু এদের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। নক্ষত্র নিজে আলো দেয়। গ্রহ নিজে আলো দেয় না। গ্রহ নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত করে। নক্ষত্রের ভেতরে পরমাণু বিক্রিয়া চলে। গ্রহের ভেতরে এমন কিছু হয় না। নক্ষত্র অনেক বড় ও ভারী। গ্রহ তুলনায় ছোট। নক্ষত্র একই জায়গায় থাকে। গ্রহ নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তাই পৃথিবী একটি গ্রহ। সূর্য একটি নক্ষত্র।
মূল পার্থক্যসমূহ:
- নক্ষত্র নিজস্ব আলো তৈরি করে, গ্রহ করে না
- নক্ষত্রে পরমাণু সংযোজন হয়, গ্রহে হয় না
- নক্ষত্র স্থির থাকে, গ্রহ কক্ষপথে ঘোরে
- নক্ষত্র অনেক বড়, গ্রহ ছোট
- নক্ষত্র গ্যাসীয়, গ্রহ কঠিন বা গ্যাসীয় হতে পারে
আকাশে নক্ষত্র দেখা যায় কেন
আকাশে নক্ষত্র দেখার কারণ হলো তাদের নিজস্ব আলো। নক্ষত্রগুলো ক্রমাগত আলো ছড়াচ্ছে। এই আলো মহাকাশ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসে। দিনের বেলা সূর্যের আলো খুব উজ্জ্বল। তাই অন্য নক্ষত্রের আলো দেখা যায় না। রাতে সূর্য থাকে না। তখন আকাশ অন্ধকার হয়। সেই সময় নক্ষত্রের দুর্বল আলোও চোখে পড়ে। আমরা যত নক্ষত্র দেখি তার বেশিরভাগই অনেক দূরে। কিছু নক্ষত্র লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। তবুও তাদের আলো আমাদের কাছে পৌঁছায়। নক্ষত্রের আলো অত্যন্ত শক্তিশালী বলেই এমন হয়।
নক্ষত্রের আলো কোথা থেকে আসে
নক্ষত্রের আলো আসে তার কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রে প্রচণ্ড চাপ ও তাপ থাকে। সেখানে হাইড্রোজেন গ্যাস পরস্পর যুক্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলে পরমাণু সংযোজন। এতে হিলিয়াম গ্যাস তৈরি হয়। সাথে মুক্ত হয় বিপুল শক্তি। এই শক্তি আলো ও তাপ হিসেবে বের হয়। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ টন হাইড্রোজেন জ্বলছে। তাই নক্ষত্র ক্রমাগত আলো দেয়। এই প্রক্রিয়া লক্ষ কোটি বছর চলতে পারে। আমাদের সূর্য প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর ধরে জ্বলছে। এখনও আরও ৫ বিলিয়ন বছর জ্বলবে।
নক্ষত্র কিভাবে মরে যায়
নক্ষত্রের জীবন শেষ হয় যখন তার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। ছোট নক্ষত্র ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। লাল দৈত্যে পরিণত হয়। তারপর সাদা বামনে পরিণত হয়। এরপর একদম ঠান্ডা হয়ে কালো বামন হয়। বড় নক্ষত্রের মৃত্যু ভিন্ন। তারা বিস্ফোরিত হয়ে সুপারনোভা হয়। এই বিস্ফোরণ অত্যন্ত শক্তিশালী। বিস্ফোরণের পর নিউট্রন তারা বা কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়। আমাদের সূর্য মাঝারি আকারের। এটি লাল দৈত্য হবে। তারপর সাদা বামন হবে। এই ঘটনা ঘটবে আরও ৫ বিলিয়ন বছর পরে।
নক্ষত্র কত প্রকার
নক্ষত্র বিভিন্ন প্রকারের হয়। আকার অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা যায়। বামন, মাঝারি ও দৈত্য নক্ষত্র। রং অনুযায়ী নক্ষত্র ৭ শ্রেণীতে পড়ে। O, B, A, F, G, K, M এই শ্রেণীগুলো। O শ্রেণী সবচেয়ে গরম ও নীল। M শ্রেণী সবচেয়ে ঠান্ডা ও লাল। আমাদের সূর্য G শ্রেণীর হলুদ নক্ষত্র। তাপমাত্রা অনুযায়ী নক্ষত্র ভিন্ন হয়। উজ্জ্বলতা অনুযায়ীও ভাগ করা যায়। কিছু নক্ষত্র একা থাকে। কিছু নক্ষত্র জোড়ায় থাকে। জোড়া নক্ষত্রকে বলে দ্বৈত তারা। তারা একে অপরের চারদিকে ঘোরে।
| নক্ষত্রের শ্রেণী | রং | তাপমাত্রা (কেলভিন) | উদাহরণ |
| O শ্রেণী | নীল | ৩০,০০০+ | জেটা ওরিয়নিস |
| B শ্রেণী | নীল-সাদা | ১০,০০০-৩০,০০০ | রিগেল |
| A শ্রেণী | সাদা | ৭,৫০০-১০,০০০ | সিরিয়াস |
| F শ্রেণী | হলুদ-সাদা | ৬,০০০-৭,৫০০ | প্রোসিয়ন |
| G শ্রেণী | হলুদ | ৫,২০০-৬,০০০ | সূর্য |
| K শ্রেণী | কমলা | ৩,৭০০-৫,২০০ | আর্কটিউরাস |
| M শ্রেণী | লাল | ২,৪০০-৩,৭০০ | বেটেলজুস |
বৃহত্তম নক্ষত্র কোনটি
বর্তমানে জানা বৃহত্তম নক্ষত্র হলো স্টিভেনসন ২-১৮। এটি আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ২১৫০ গুণ বড়। এই নক্ষত্র এত বিশাল যে এর ভেতরে প্রায় ১০ বিলিয়ন সূর্য ঢুকে যাবে। এটি একটি লাল সুপারজায়ান্ট। পৃথিবী থেকে প্রায় ২০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে। এর ব্যাস প্রায় ৩ বিলিয়ন কিলোমিটার। যদি এটি সূর্যের জায়গায় থাকত তবে শনি গ্রহ পর্যন্ত ঢেকে ফেলত। এছাড়া UY স্কুটি, বেটেলজুস এগুলোও অনেক বড়। তবে সঠিক আকার মাপা কঠিন। কারণ এরা অনেক দূরে থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন বড় নক্ষত্র আবিষ্কার হচ্ছে।
ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র কোনটি
ক্ষুদ্রতম নক্ষত্রগুলো লাল বামন শ্রেণীর। EBLM J0555-57Ab বর্তমানে জানা সবচেয়ে ছোট নক্ষত্র। এটি আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে সামান্য বড়। কিন্তু ভর ৮৫ গুণ বেশি। এর ব্যাস মাত্র প্রায় ১,৪০,০০০ কিলোমিটার। এটি পৃথিবী থেকে ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে। এত ছোট হলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নক্ষত্র। এর কেন্দ্রে পরমাণু সংযোজন চলে। লাল বামন নক্ষত্র অনেক দিন বাঁচে। কারণ এরা ধীরে ধীরে জ্বালানি খরচ করে। কিছু লাল বামন ট্রিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে। আমাদের মহাবিশ্বের অধিকাংশ নক্ষত্রই লাল বামন।
নক্ষত্রের জীবনচক্র
নক্ষত্রের জীবন শুরু হয় নীহারিকা থেকে। প্রথমে প্রোটোস্টার বা আদি নক্ষত্র তৈরি হয়। এরপর মূল ক্রম নক্ষত্র হয়। এই পর্যায়ে নক্ষত্র স্থিরভাবে হাইড্রোজেন পোড়ায়। আমাদের সূর্য এই পর্যায়ে আছে। এটি প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর টিকবে। হাইড্রোজেন শেষ হলে নক্ষত্র ফুলে ওঠে। লাল দৈত্যে পরিণত হয়। ছোট নক্ষত্র পরে সাদা বামন হয়। বড় নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের পর নিউট্রন তারা বা কৃষ্ণগহ্বর হয়। পুরো প্রক্রিয়া লক্ষ কোটি বছর সময় নেয়। নক্ষত্রের ভর এর জীবনকাল নির্ধারণ করে।
নক্ষত্রের জীবনচক্রের ধাপ:
- নীহারিকা থেকে জন্ম
- প্রোটোস্টার গঠন
- মূল ক্রম নক্ষত্র
- লাল দৈত্য/সুপারজায়ান্ট
- সাদা বামন/সুপারনোভা
- কৃষ্ণ বামন/নিউট্রন তারা/কৃষ্ণগহ্বর
নক্ষত্রের গঠন প্রক্রিয়া
নক্ষত্র গঠন হয় আণবিক মেঘ থেকে। এই মেঘ হাইড্রোজেন ও ধুলো দিয়ে ভরা। কোনো ঘটনা মেঘের একটি অংশ সংকুচিত করে। হতে পারে সুপারনোভা বিস্ফোরণ বা দুটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ। সংকোচন শুরু হলে মাধ্যাকর্ষণ বাড়ে। আরও বেশি গ্যাস টেনে আনে। কেন্দ্রে চাপ ও তাপ বাড়তে থাকে। প্রায় ১০ মিলিয়ন ডিগ্রি তাপে পরমাণু সংযোজন শুরু হয়। তখন নক্ষত্র আলো দিতে শুরু করে। চারপাশের গ্যাস উড়িয়ে দেয়। নতুন নক্ষত্র দৃশ্যমান হয়। পুরো প্রক্রিয়া লক্ষ বছর নেয়। একসাথে অনেক নক্ষত্র জন্মাতে পারে। এদের বলে তারা গুচ্ছ।
নক্ষত্রের রং কী নির্দেশ করে
নক্ষত্রের রং তার তাপমাত্রা নির্দেশ করে। নীল নক্ষত্র সবচেয়ে গরম। এদের তাপ ৩০,০০০ ডিগ্রিরও বেশি। সাদা নক্ষত্র কিছুটা কম গরম। আমাদের সূর্য হলুদ রঙের। এর তাপ প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি। কমলা নক্ষত্র আরও ঠান্ডা। লাল নক্ষত্র সবচেয়ে ঠান্ডা। তবে ঠান্ডা মানে ৩,০০০ ডিগ্রি! নক্ষত্রের বয়স বাড়লে রং পরিবর্তন হয়। যুব নক্ষত্র নীল-সাদা। বৃদ্ধ নক্ষত্র লাল। রং দেখে জ্যোতির্বিদরা নক্ষত্রের অনেক কিছু জানেন। তাপমাত্রা, বয়স, আকার সব বুঝতে পারেন। এজন্য নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করা হয়।
| রং | তাপমাত্রা (কেলভিন) | শ্রেণী | উদাহরণ |
| নীল | ৩০,০০০+ | O, B | রিগেল |
| সাদা | ৭,৫০০-১০,০০০ | A | সিরিয়াস |
| হলুদ | ৫,২০০-৬,০০০ | G | সূর্য |
| কমলা | ৩,৭০০-৫,২০০ | K | আলফা সেন্টরি |
| লাল | ২,৪০০-৩,৭০০ | M | প্রক্সিমা সেন্টরি |
রাতের আকাশে নক্ষত্র কেন জ্বলে
রাতের আকাশে নক্ষত্র জ্বলে কারণ তারা ক্রমাগত শক্তি উৎপাদন করছে। নক্ষত্রের কেন্দ্রে চলছে পরমাণু সংযোজন। এতে প্রতি মুহূর্তে বিপুল শক্তি তৈরি হয়। এই শক্তি আলো ও তাপ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মহাকাশ খালি বলে আলো বাধা পায় না। লক্ষ আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসে। রাতে আকাশ অন্ধকার থাকে। তখন নক্ষত্রের আলো স্পষ্ট দেখা যায়। দিনে সূর্যের আলো এত উজ্জ্বল যে অন্য নক্ষত্র দেখা যায় না। আসলে দিনেও নক্ষত্র আছে। শুধু দেখা যায় না। নক্ষত্রের আলো ক্রমাগত পৃথিবীতে আসছে।
নক্ষত্রের আলোর গতি
নক্ষত্রের আলো আসে আলোর গতিতে। আলোর গতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এটি মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতি। কিছুই এর চেয়ে দ্রুত যেতে পারে না। সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড। সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরি। এর আলো আসতে সময় লাগে ৪.২৪ বছর! মানে আমরা যে আলো দেখছি তা ৪ বছর আগের। দূরের নক্ষত্রের আলো লক্ষ বছর লাগে। তাই আমরা অতীত দেখছি। যে নক্ষত্র দেখছি তা হয়তো এখন নেই। আলোর গতি সীমাবদ্ধ বলেই এমন হয়। নক্ষত্র দেখা মানে অতীতে তাকানো।
নক্ষত্রের দূরত্ব কিভাবে মাপা হয়
নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় বিভিন্ন পদ্ধতিতে। কাছের নক্ষত্রের জন্য ব্যবহার হয় প্যারালাক্স পদ্ধতি। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। ৬ মাস পর পৃথিবীর অবস্থান পাল্টায়। তখন নক্ষত্রের অবস্থান সামান্য সরে দেখায়। এই সরণ মেপে দূরত্ব বের করা হয়। দূরের নক্ষত্রের জন্য ব্যবহার হয় উজ্জ্বলতা। নক্ষত্র যত দূরে তত ঝাপসা দেখায়। প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দেখা উজ্জ্বলতা তুলনা করে দূরত্ব বের করা হয়। সিফিড ভেরিয়েবল নক্ষত্র ব্যবহার করা হয়। এরা নিয়মিত উজ্জ্বল ও ম্লান হয়। এই চক্র থেকে দূরত্ব জানা যায়। রেডশিফট পদ্ধতি দিয়ে অনেক দূরের নক্ষত্র মাপা হয়।
দূরত্ব মাপার পদ্ধতি:
- প্যারালাক্স (কাছের নক্ষত্র)
- স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল (মাঝারি দূরত্ব)
- সিফিড ভেরিয়েবল (দূরের নক্ষত্র)
- রেডশিফট (অতি দূরের নক্ষত্র)
- স্পেক্ট্রোস্কোপিক প্যারালাক্স
নক্ষত্রের মানচিত্র
নক্ষত্রের মানচিত্র বলতে বোঝায় আকাশে নক্ষত্রের অবস্থান চিহ্নিত করা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নক্ষত্র মানচিত্র তৈরি করছে। নক্ষত্রপুঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ এগুলো বিখ্যাত নক্ষত্রপুঞ্জ। আধুনিক মানচিত্র অনেক নিখুঁত। টেলিস্কোপ দিয়ে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। গায়া মিশন পুরো আকাশের মানচিত্র তৈরি করছে। এতে প্রায় ২ বিলিয়ন নক্ষত্রের তথ্য আছে। মানচিত্র দেখে জ্যোতির্বিদরা নক্ষত্র খুঁজে পান। অ্যাপে নক্ষত্র মানচিত্র পাওয়া যায়। এগুলো দিয়ে রাতের আকাশে নক্ষত্র চেনা সহজ। মানচিত্র নাবিকদের পথ দেখাতে সাহায্য করত।
নক্ষত্র ও ছায়াপথের সম্পর্ক
ছায়াপথ হলো নক্ষত্রের বিশাল সমাবেশ। আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা। এতে প্রায় ২০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র আছে। নক্ষত্রগুলো ছায়াপথের ভেতর ঘোরে। ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকে বিশাল কৃষ্ণগহ্বর। এর মাধ্যাকর্ষণে সব নক্ষত্র বাঁধা। আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গার প্রান্তে। কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৬,০০০ আলোকবর্ষ দূরে। সূর্য ছায়াপথের চারদিকে ঘোরে। একবার ঘুরতে সময় লাগে ২২৫-২৫০ মিলিয়ন বছর। ছায়াপথ ছাড়া নক্ষত্র থাকতে পারে না। প্রতিটি নক্ষত্র কোনো না কোনো ছায়াপথের অংশ। মহাবিশ্বে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নক্ষত্র আছে।
| ছায়াপথের অংশ | নক্ষত্র সংখ্যা | বিশেষত্ব |
| কেন্দ্রীয় বাল্জ | ২০ বিলিয়ন | ঘন জমাট, পুরনো নক্ষত্র |
| সর্পিল বাহু | ১০০ বিলিয়ন | নতুন নক্ষত্র জন্মায় |
| হেলো | ১০ বিলিয়ন | পুরনো গোলাকার গুচ্ছ |
| ডিস্ক | ২০০ বিলিয়ন | বেশিরভাগ নক্ষত্র |
নক্ষত্র কীভাবে তাপ উৎপাদন করে
নক্ষত্র তাপ উৎপাদন করে পরমাণু সংযোজন দিয়ে। কেন্দ্রে চাপ ও তাপ অত্যধিক। হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো পরস্পর ধাক্কা খায়। প্রচণ্ড তাপে তারা যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় ভর কিছুটা কমে। কমে যাওয়া ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইনের E=mc² সূত্র অনুযায়ী। অল্প ভরেও প্রচুর শক্তি তৈরি হয়। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ টন হাইড্রোজেন জ্বলে। তাই নক্ষত্র ক্রমাগত তাপ দেয়। এই তাপ বাইরের দিকে ছড়ায়। নক্ষত্রের পৃষ্ঠে পৌঁছায়। সেখান থেকে মহাকাশে বিকিরিত হয়। তাপ ও আলো একসাথে তৈরি হয়।
নক্ষত্র পতন (shooting star) আসলে কী
নক্ষত্র পতন আসলে নক্ষত্র নয়। এগুলো উল্কা। ছোট পাথর বা ধুলো মহাকাশে ভাসছিল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকলে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে। আকাশে উজ্জ্বল রেখা দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যায়। মানুষ একে নক্ষত্র পতন বলে। কিন্তু প্রকৃত নক্ষত্র এভাবে পড়ে না। নক্ষত্র বিশাল ও অনেক দূরে। উল্কা ছোট ও কাছে। বেশিরভাগ উল্কা একদম পুড়ে যায়। কিছু মাটিতে পড়ে। তখন তাকে বলে উল্কাপিণ্ড। প্রতিদিন হাজার হাজার উল্কা পৃথিবীতে আসে। অধিকাংশ খুবই ছোট। উল্কাবৃষ্টি মাঝেমাঝে ঘটে। তখন অনেক উল্কা দেখা যায়। এগুলো দেখতে সুন্দর ও রোমাঞ্চকর।
উল্কা ও নক্ষত্রের পার্থক্য:
- উল্কা ছোট পাথর, নক্ষত্র বিশাল গ্যাসীয় বল
- উল্কা কাছে, নক্ষত্র দূরে
- উল্কা কয়েক সেকেন্ড দেখা যায়, নক্ষত্র সবসময় থাকে
- উল্কা পুড়ে যায়, নক্ষত্র লক্ষ বছর জ্বলে
- উল্কা বায়ুমণ্ডলে জ্বলে, নক্ষত্র মহাকাশে
নক্ষত্রের ভিতরে কি থাকে
নক্ষত্রের ভিতরে মূলত গ্যাস থাকে। প্রায় ৭০% হাইড্রোজেন। ২৮% হিলিয়াম। বাকি ২% অন্যান্য মৌল। কেন্দ্র সবচেয়ে ঘন ও গরম। এখানে তাপমাত্রা কোটি কোটি ডিগ্রি। চাপ অকল্পনীয় বেশি। কেন্দ্রেই পরমাণু সংযোজন হয়। বাইরের স্তরগুলো কম ঘন। পৃষ্ঠের তাপ কয়েক হাজার ডিগ্রি। নক্ষত্রের ভেতর স্তরে স্তরে সাজানো। কেন্দ্র, বিকিরণ অঞ্চল, সংবহন অঞ্চল, ফটোস্ফিয়ার। কেন্দ্র থেকে শক্তি বাইরে যায়। লক্ষ বছর লাগে কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠে পৌঁছাতে। নক্ষত্রের ভর যত বেশি ভেতরের চাপ তত বেশি। তাই বড় নক্ষত্র দ্রুত জ্বলে।
নক্ষত্রের শক্তির উৎস
নক্ষত্রের শক্তির উৎস পরমাণু সংযোজন। কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত হয়। চারটি হাইড্রোজেন মিলে একটি হিলিয়াম তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য ভর হারিয়ে যায়। হারানো ভর শক্তিতে রূপান্তর হয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E=mc²। এখানে c আলোর গতি। একটি বিশাল সংখ্যা। তাই অল্প ভর থেকেও বিপুল শক্তি তৈরি হয়। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য ৪ মিলিয়ন টন ভর শক্তিতে বদলায়। এই শক্তি আলো ও তাপ আকারে ছড়ায়। পরমাণু সংযোজন চেইন রিঅ্যাকশনের মতো। একবার শুরু হলে লক্ষ কোটি বছর চলতে থাকে। এটিই নক্ষত্রের প্রাণশক্তি। হাইড্রোজেন শেষ হলে হিলিয়াম জ্বলতে শুরু করে।
নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু চক্র
নক্ষত্রের জন্ম হয় নীহারিকা থেকে। গ্যাস ও ধুলো একত্রিত হয়। মাধ্যাকর্ষণে সংকুচিত হয়। প্রথম আলো জ্বলে। নতুন নক্ষত্র জন্ম নেয়। তারপর লক্ষ কোটি বছর স্থিরভাবে জ্বলে। এই সময়কে বলে মূল ক্রম। জ্বালানি শেষ হতে শুরু করলে ফুলে ওঠে। লাল দৈত্য বা সুপারজায়ান্ট হয়। শেষে মৃত্যু হয়। ছোট নক্ষত্র শান্তভাবে মরে। সাদা বামন হয়। বড় নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়। সুপারনোভা ঘটে। অবশেষ নিউট্রন তারা বা কৃষ্ণগহ্বর হয়। মৃত নক্ষত্রের গ্যাস মহাকাশে ছড়ায়। সেখান থেকে নতুন নক্ষত্র জন্মায়। এভাবে চক্র চলতে থাকে। আমাদের শরীরের মৌলগুলো পুরনো নক্ষত্র থেকে এসেছে।
| পর্যায় | ছোট নক্ষত্র | বড় নক্ষত্র | সময় |
| জন্ম | নীহারিকা সংকোচন | নীহারিকা সংকোচন | লক্ষ বছর |
| মূল ক্রম | হাইড্রোজেন জ্বলছে | হাইড্রোজেন জ্বলছে | বিলিয়ন বছর |
| বার্ধক্য | লাল দৈত্য | লাল সুপারজায়ান্ট | মিলিয়ন বছর |
| মৃত্যু | সাদা বামন | সুপারনোভা | তাৎক্ষণিক |
| শেষ অবস্থা | কালো বামন | নিউট্রন তারা/কৃষ্ণগহ্বর | অনন্তকাল |
নক্ষত্রের চেহারা কেমন
নক্ষত্রের চেহারা সাধারণত গোলাকার। মাধ্যাকর্ষণ সব দিক থেকে সমান টানে। তাই গোলাকার আকৃতি হয়। পৃষ্ঠ উত্তপ্ত গ্যাসে ভরা। ফুটন্ত পানির মতো নড়াচড়া করে। সৌর কলঙ্ক দেখা যায়। এগুলো শীতল অঞ্চল। সৌর শিখা বের হয়। এগুলো বিশাল আগুনের জিহ্বার মতো। করোনা নামে বাইরের স্তর আছে। এটি খুব গরম কিন্তু পাতলা। দূর থেকে নক্ষত্র শুধু আলোর বিন্দু দেখায়। কারণ অনেক দূরে। টেলিস্কোপ দিয়েও বেশিরভাগ নক্ষত্রের পৃষ্ঠ দেখা যায় না। শুধু সূর্যের পৃষ্ঠ ভালো দেখা যায়। কারণ এটি কাছে। কিছু বিশাল নক্ষত্রের পৃষ্ঠ ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। বেটেলজুসের পৃষ্ঠ দেখা গেছে।
নক্ষত্র কি সূর্যের মতো
হ্যাঁ, সূর্য একটি সাধারণ নক্ষত্র। আকাশের সব নক্ষত্র সূর্যের মতোই। শুধু দূরত্বের কারণে ছোট দেখায়। সূর্য আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। মাত্র ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। অন্য নক্ষত্র লক্ষ লক্ষ গুণ দূরে। তাই ছোট বিন্দু মনে হয়। সূর্য মাঝারি আকারের হলুদ নক্ষত্র। অনেক নক্ষত্র সূর্যের চেয়ে বড়। অনেক নক্ষত্র ছোট। কিছু নক্ষত্র সূর্যের মতোই। তাদের বলে সৌর-সদৃশ নক্ষত্র। এদের চারদিকেও গ্রহ থাকতে পারে। হাজার হাজার এমন নক্ষত্র পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের গ্রহ আছে। এদের বলে বহির্গ্রহ। সূর্য বিশেষ কারণ এটি কাছে। আর এর গ্রহে আমরা থাকি।
সূর্য ও অন্য নক্ষত্রের তুলনা:
- সূর্য মাঝারি আকারের G শ্রেণীর নক্ষত্র
- অনেক নক্ষত্র সূর্যের চেয়ে ১০০০ গুণ বড়
- অনেক নক্ষত্র সূর্যের চেয়ে ১০ গুণ ছোট
- সূর্যের মতো নক্ষত্র মহাবিশ্বে সাধারণ
- লক্ষ লক্ষ সৌর-সদৃশ নক্ষত্র আছে
নক্ষত্র কি চোখে দেখা যায়
হ্যাঁ, নক্ষত্র খালি চোখে দেখা যায়। রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে হাজার হাজার নক্ষত্র দেখা যায়। শহরে আলো দূষণে কম দেখা যায়। গ্রামে বা পাহাড়ে অনেক নক্ষত্র দেখা যায়। সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র সিরিয়াস। এটি খুব স্পষ্ট দেখায়। কালপুরুষ নক্ষত্রপুঞ্জ সহজে চেনা যায়। সপ্তর্ষিমণ্ডল পরিচিত। টেলিস্কোপ দিয়ে লক্ষ নক্ষত্র দেখা যায়। খালি চোখে প্রায় ৫০০০-৬০০০ নক্ষত্র দেখা সম্ভব। তবে একসাথে সব দেখা যায় না। দিগন্তের নিচে অনেক থাকে। কিছু নক্ষত্র দিনেও দেখা যায়। সূর্যগ্রহণের সময় উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যায়। দুরবীন দিয়ে আরও ভালো দেখা যায়।
নক্ষত্র কেন টিমটিম করে
নক্ষত্র টিমটিম করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কারণে। নক্ষত্রের আলো সোজা আসে না। বায়ুমণ্ডল দিয়ে আসতে হয়। বাতাসের ঘনত্ব সব জায়গায় সমান নয়। ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। আলো বাতাসের স্তর দিয়ে যেতে বেঁকে যায়। প্রতিসরণ ঘটে। মুহূর্তে মুহূর্তে আলোর পথ পাল্টায়। তাই নক্ষত্র টিমটিম করে দেখায়। আসলে নক্ষত্র সব সময় সমানভাবে জ্বলছে। শুধু আমাদের কাছে টিমটিম লাগে। গ্রহ টিমটিম করে না। কারণ তারা কাছে ও বড় দেখায়। মহাকাশে গেলে নক্ষত্র টিমটিম করে না। কারণ সেখানে বায়ুমণ্ডল নেই। দিগন্তের কাছে নক্ষত্র বেশি টিমটিম করে। কারণ আলো বেশি বাতাস পার হয়।
নক্ষত্রের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা
বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞায় নক্ষত্র হলো মহাকাশীয় প্লাজমা গোলক। এটি মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে আবদ্ধ। কেন্দ্রে পরমাণু সংযোজন বিক্রিয়া ঘটে। এতে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়। শক্তি বিকিরণ আকারে নির্গত হয়। নক্ষত্রের ভর সৌর ভরের ০.০৮ থেকে ১০০ গুণ। এর চেয়ে কম হলে বাদামি বামন হয়। এর চেয়ে বেশি হলে টিকে না। নক্ষত্র হাইড্রোস্ট্যাটিক ভারসাম্যে থাকে। মাধ্যাকর্ষণ ভেতরে টানে। চাপ বাইরে ঠেলে। দুটো সমান হলে নক্ষত্র স্থিতিশীল থাকে। নক্ষত্রের জীবনকাল ভরের ওপর নির্ভর করে। ভারী নক্ষত্র দ্রুত মরে। হালকা নক্ষত্র দীর্ঘদিন বাঁচে।
নক্ষত্রের মূল বৈশিষ্ট্য:
- স্ব-মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা আবদ্ধ প্লাজমা গোলক
- কেন্দ্রে পরমাণু সংযোজন সক্রিয়
- হাইড্রোস্ট্যাটিক ভারসাম্যে স্থিতিশীল
- আলো ও তাপ বিকিরণ করে
- ভর সূর্যের ০.০৮ থেকে ১০০ গুণ
নক্ষত্রের বিস্ফোরণ (Supernova) কী

সুপারনোভা হলো বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যু বিস্ফোরণ। নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হলে এটি ঘটে। কেন্দ্র হঠাৎ ধসে পড়ে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। সেকেন্ডে পুরো নক্ষত্র উড়ে যায়। বিস্ফোরণ এত উজ্জ্বল যে পুরো গ্যালাক্সির সমান আলো দেয়। কয়েক সপ্তাহ উজ্জ্বল থাকে। তারপর ধীরে ধীরে নিভে যায়। সুপারনোভায় ভারী মৌল তৈরি হয়। সোনা, রূপা, ইউরেনিয়াম সব এভাবে তৈরি। বিস্ফোরিত গ্যাস মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে নতুন নক্ষত্র জন্মায়। বিস্ফোরণের পর নিউট্রন তারা বা কৃষ্ণগহ্বর থাকে। সুপারনোভা দেখা বিরল ঘটনা। প্রতি ১০০ বছরে একটি ঘটে আমাদের গ্যালাক্সিতে। ১৯৮৭ সালে একটি দেখা গিয়েছিল।
নক্ষত্র কি সব গ্যালাক্সিতে আছে
হ্যাঁ, সব গ্যালাক্সিতেই নক্ষত্র আছে। গ্যালাক্সি মূলত নক্ষত্রের সমষ্টি। কোটি কোটি নক্ষত্র নিয়ে গঠিত। ছোট গ্যালাক্সিতে কয়েক মিলিয়ন নক্ষত্র। বড় গ্যালাক্সিতে ট্রিলিয়ন নক্ষত্র। আমাদের আকাশগঙ্গায় প্রায় ২০০-৪০০ বিলিয়ন। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে ১ ট্রিলিয়ন। কিছু বামন গ্যালাক্সি আছে। তাতে মাত্র কয়েক লক্ষ নক্ষত্র। উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে পুরনো নক্ষত্র। সর্পিল গ্যালাক্সিতে নতুন নক্ষত্র জন্মাচ্ছে। মহাবিশ্বে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে। প্রতিটিতে কোটি কোটি নক্ষত্র। মোট নক্ষত্র সংখ্যা কল্পনাতীত। সব নক্ষত্র মিলিয়ে প্রায় ১০^২৪ বা তার বেশি। এটি পৃথিবীর সব বালুকণার চেয়েও বেশি।
| গ্যালাক্সির ধরন | নক্ষত্র সংখ্যা | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
| বামন গ্যালাক্সি | ১০⁶ – ১০⁹ | ছোট, কম ভর | সেগিটেরিয়াস বামন |
| সর্পিল গ্যালাক্সি | ১০⁹ – ১০¹² | নতুন নক্ষত্র জন্মায় | আকাশগঙ্গা |
| উপবৃত্তাকার | ১০⁹ – ১০¹³ | পুরনো নক্ষত্র | M87 |
| অনিয়মিত | ১০⁸ – ১০¹⁰ | আকৃতি অসম | ম্যাগেলানিক মেঘ |
উপসংহার
নক্ষত্র আমাদের মহাবিশ্বের মূল ভিত্তি। এরা শুধু আলো দেয় না। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌল তৈরি করে। আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন সব নক্ষত্রে তৈরি হয়েছিল। সূর্য ছাড়া পৃথিবীতে জীবন থাকত না। নক্ষত্র সম্পর্কে জানা মানে নিজেদের সম্পর্কে জানা। আমরা নক্ষত্রের সন্তান। আজকের বিজ্ঞান অনেক কিছু জানিয়েছে। তবে এখনও অনেক রহস্য বাকি। প্রতিদিন নতুন নক্ষত্র আবিষ্কার হচ্ছে। নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রাতের আকাশে তাকালে মনে রাখবেন। প্রতিটি বিন্দু একটি সূর্যের মতো। হয়তো তার চারদিকেও গ্রহ আছে। হয়তো সেখানেও জীবন আছে। নক্ষত্র আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। এরা আমাদের মহাজাগতিক পরিবার।
লেখকের নোট: এই নিবন্ধে নক্ষত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে যাতে সবাই বুঝতে পারে। নক্ষত্রের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আশা করি এই লেখা আপনার জ্ঞান বাড়াবে। রাতের আকাশে তাকালে এখন নক্ষত্র সম্পর্কে আরও ভালো বুঝতে পারবেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQs)
নক্ষত্র কি গ্রহের চেয়ে বড়?
হ্যাঁ, নক্ষত্র সাধারণত গ্রহের চেয়ে অনেক বড়। এমনকি ক্ষুদ্রতম নক্ষত্রও পৃথিবীর চেয়ে বড়। আমাদের সূর্য পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১০৯ গুণ বড়। তবে কিছু বড় গ্রহ ছোট নক্ষত্রের কাছাকাছি আকারের হতে পারে। যেমন বৃহস্পতি ও ছোট লাল বামন নক্ষত্র। কিন্তু ভরে নক্ষত্র সবসময় বেশি।
নক্ষত্র কতদিন বাঁচে?
নক্ষত্রের জীবনকাল তার ভরের ওপর নির্ভর করে। ছোট লাল বামন নক্ষত্র ট্রিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে। আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্র প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর বাঁচে। বড় নক্ষত্র মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর বাঁচে। যত ভারী নক্ষত্র তত দ্রুত জ্বালানি শেষ হয়। তাই দ্রুত মারা যায়।
রাতে কতগুলো নক্ষত্র দেখা যায়?
খালি চোখে পরিষ্কার আকাশে প্রায় ৫০০০-৬০০০ নক্ষত্র দেখা যায়। তবে একবারে সব দেখা যায় না। দিগন্তের নিচে অর্ধেক থাকে। তাই যে কোনো সময় প্রায় ২৫০০-৩০০০ দেখা সম্ভব। শহরে আলো দূষণে মাত্র কয়েক শ দেখা যায়। গ্রামে বা পাহাড়ে অনেক বেশি দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে লক্ষ লক্ষ দেখা যায়।
নক্ষত্র কি নড়াচড়া করে?
হ্যাঁ, সব নক্ষত্রই নড়াচড়া করে। তবে অনেক দূরে থাকায় আমরা বুঝতে পারি না। নক্ষত্র তাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে। আমাদের সূর্য মহাকাশে সেকেন্ডে ২২০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। অন্য নক্ষত্রও তাদের নিজস্ব গতিতে চলছে। হাজার বছর পর নক্ষত্রপুঞ্জের আকৃতি পাল্টে যাবে। কারণ নক্ষত্রগুলো নড়ছে।
নক্ষত্র কি বিস্ফোরিত হতে পারে?
হ্যাঁ, বড় নক্ষত্র জীবনের শেষে বিস্ফোরিত হয়। একে সুপারনোভা বলে। এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি। বিস্ফোরণে পুরো গ্যালাক্সির সমান আলো হয়। ছোট ও মাঝারি নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয় না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে মারা যায়। আমাদের সূর্য বিস্ফোরিত হবে না। এটি লাল দৈত্য হবে তারপর সাদা বামন হবে।
কোন নক্ষত্র পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে?
সূর্য পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। এটি মাত্র ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য ছাড়া সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরি। এটি ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। মানে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার! আলোর গতিতে গেলেও সাড়ে চার বছর লাগবে। আমাদের দ্রুততম মহাকাশযান দিয়ে যেতে হাজার হাজার বছর লাগবে।
নক্ষত্র কি সব একই রকম?
না, নক্ষত্র অনেক ধরনের হয়। আকার, রং, তাপমাত্রা, ভর সব ভিন্ন। ক্ষুদ্রতম নক্ষত্র বৃহস্পতির মতো। বৃহত্তম নক্ষত্র সূর্যের ২০০০ গুণ বড়। লাল নক্ষত্র ঠান্ডা। নীল নক্ষত্র গরম। কিছু একা থাকে। কিছু জোড়ায় থাকে। কিছু গুচ্ছে থাকে। তবে সব নক্ষত্রের মূল প্রক্রিয়া একই। কেন্দ্রে পরমাণু সংযোজন।
নতুন নক্ষত্র এখনও জন্মাচ্ছে কি?
হ্যাঁ, এখনও প্রতিদিন নতুন নক্ষত্র জন্মাচ্ছে। আমাদের গ্যালাক্সিতে বছরে প্রায় ৩-৭টি নক্ষত্র জন্মায়। পুরো মহাবিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার নক্ষত্র জন্মাচ্ছে। নীহারিকায় এখনও প্রচুর গ্যাস আছে। সেখান থেকে নতুন নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে গ্যাস ফুরিয়ে গেলে নক্ষত্র জন্ম কমে যাবে। কোটি কোটি বছর পর মহাবিশ্ব অন্ধকার হয়ে যাবে।
নক্ষত্রের চারদিকে কি গ্রহ থাকে?
অনেক নক্ষত্রের চারদিকে গ্রহ থাকে। আমাদের সৌরজগতের মতো। এ পর্যন্ত ৫০০০ এর বেশি বহির্গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে। প্রায় প্রতিটি নক্ষত্রের কমপক্ষে একটি গ্রহ আছে বলে মনে করা হয়। কিছু গ্রহ পৃথিবীর মতো। কিছু বৃহস্পতির মতো। কিছু গ্রহে হয়তো প্রাণ থাকতে পারে। জ্যোতির্বিদরা প্রতিদিন নতুন গ্রহ খুঁজছেন।
কৃষ্ণগহ্বর কি নক্ষত্র?
কৃষ্ণগহ্বর মৃত নক্ষত্রের অবশেষ। বিশাল নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। এর মাধ্যাকর্ষণ এত শক্তিশালী যে আলোও পালাতে পারে না। তাই এটি সম্পূর্ণ কালো দেখায়। কৃষ্ণগহ্বর নিজে আলো দেয় না। এটি আর জ্বলন্ত নক্ষত্র নয়। তবে এটি নক্ষত্র ছিল। এখন এটি নক্ষত্রের চূড়ান্ত পরিণতি। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍






