ধান আমাদের প্রধান খাদ্য ফসল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ভাত খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই ধানের ভালো ফলন পাওয়া খুব জরুরি। কিন্তু ভালো ফলন পেতে হলে সঠিকভাবে সার দিতে হবে। অনেক কৃষক জানেন না কোন সার কখন দিতে হয়। এই কারণে ফলন কম হয় এবং টাকা নষ্ট হয়। আজকের এই লেখায় আমরা ধান চাষে সার প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত জানব। সঠিক সার সঠিক সময়ে দিলে ফলন বাড়ে। খরচও কমে। চলুন শুরু করি।
ধান চাষে সার প্রয়োগ পদ্ধতি

ধান চাষে সার প্রয়োগ পদ্ধতি সঠিকভাবে জানা দরকার। ভুল পদ্ধতিতে সার দিলে গাছ মরে যেতে পারে। অথবা ফলন খুব কম হয়। সাধারণত দুইভাবে সার দেওয়া হয়। একটি হলো জমি তৈরির সময়। আরেকটি হলো গাছ বড় হওয়ার পর। প্রথম ভাগকে বলা হয় বেসাল ডোজ। দ্বিতীয় ভাগকে বলা হয় টপ ড্রেসিং। জমিতে সার ছিটানোর পর মাটির সাথে ভালোভাবে মেশাতে হয়। ভেজা মাটিতে সার দিলে ভালো কাজ করে। শুকনো মাটিতে সার দিলে তেমন ফল পাওয়া যায় না। তাই সার দেওয়ার আগে জমিতে পানি দিন।
ধানের জমিতে সার প্রয়োগের নিয়ম
ধানের জমিতে সার প্রয়োগের নিয়ম মেনে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এলোমেলোভাবে সার দিলে লাভ হয় না। প্রথমে মাটি পরীক্ষা করা উচিত। মাটি পরীক্ষা করলে জানা যায় কোন পুষ্টি কম আছে। সেই অনুযায়ী সার দিতে হয়। জমি তৈরির সময় টিএসপি, এমওপি এবং জিংক সার দিতে হয়। ইউরিয়া সার তিন ভাগে ভাগ করে দিতে হয়। একসাথে বেশি ইউরিয়া দিলে গাছ পুড়ে যেতে পারে। সার সবসময় বিকেলে দেওয়া ভালো। রোদের সময় সার দিলে উড়ে যায়।
ধান চাষে কোন সার ব্যবহার করা হয়
ধান চাষে কোন সার ব্যবহার করা হয় তা অনেকে জানেন না। ধান গাছের জন্য বেশ কয়েকটি সার দরকার হয়। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| সারের নাম | কাজ | প্রয়োগের সময় |
| ইউরিয়া | নাইট্রোজেন সরবরাহ করে | তিন ভাগে দিতে হয় |
| টিএসপি | ফসফরাস সরবরাহ করে | জমি তৈরির সময় |
| এমওপি | পটাশিয়াম সরবরাহ করে | জমি তৈরির সময় |
| জিংক সালফেট | জিংক সরবরাহ করে | জমি তৈরির সময় |
এই সারগুলো ধান গাছের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। জৈব সারও ব্যবহার করা যায়। কম্পোস্ট বা গোবর সার মাটি ভালো রাখে।
ধান চাষে ইউরিয়া সার প্রয়োগ পদ্ধতি
ধান চাষে ইউরিয়া সার প্রয়োগ পদ্ধতি একটু আলাদা। ইউরিয়া হলো নাইট্রোজেনের সবচেয়ে ভালো উৎস। ধান গাছ নাইট্রোজেন ছাড়া সবুজ হয় না। ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে দিতে হয়। প্রথম কিস্তি দিতে হয় চারা লাগানোর ৭ থেকে ১০ দিন পর। দ্বিতীয় কিস্তি দিতে হয় ২৫ থেকে ৩০ দিন পর। তৃতীয় কিস্তি দিতে হয় ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর। ইউরিয়া সার সবসময় ভেজা মাটিতে দিতে হয়। সার দেওয়ার পর জমিতে হাল্কা পানি রাখুন। এতে সার মাটিতে ভালোভাবে মিশে যায় এবং গাছ সহজে নিতে পারে।
ধান চাষে টিএসপি সার প্রয়োগ
ধান চাষে টিএসপি সার প্রয়োগ করা হয় জমি তৈরির সময়। টিএসপি মানে ট্রিপল সুপার ফসফেট। এই সার ধান গাছের শিকড় মজবুত করে। ফুল ও ফল তৈরিতে সাহায্য করে। বোরো ধানে প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১০ কেজি টিএসপি দিতে হয়। আমন ধানে প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৮ কেজি দিতে হয়। টিএসপি সার একবারেই দিতে হয়। ভাগ করে দেওয়ার দরকার নেই। জমি চাষ দেওয়ার আগে ছিটিয়ে দিন। তারপর মাটির সাথে ভালোভাবে মেশান। মাটি ভেজা থাকলে সার ভালো কাজ করে।
ধান চাষে এমওপি সার প্রয়োগ
ধান চাষে এমওপি সার প্রয়োগ পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণ করে। এমওপি মানে মিউরেট অব পটাশ। পটাশিয়াম ধান গাছকে রোগ থেকে রক্ষা করে। ঝড় বা বন্যায় গাছ পড়ে যাওয়া ঠেকায়। দানা মোটা ও ভারী হতে সাহায্য করে। বোরো ধানে প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ কেজি এমওপি দিতে হয়। আমন ধানে প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১০ কেজি দিতে হয়। এমওপি সার দুই ভাগে দেওয়া ভালো। অর্ধেক জমি তৈরির সময়। বাকি অর্ধেক চারা লাগানোর ৩০ দিন পর।
ধানের জন্য NPK সার ব্যবহার
ধানের জন্য NPK সার ব্যবহার খুব কার্যকর। NPK মানে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম। এই তিনটি পুষ্টি ধান গাছের সবচেয়ে বেশি দরকার। NPK সার একসাথে তিনটি পুষ্টি সরবরাহ করে। এতে আলাদা আলাদা সার দেওয়ার ঝামেলা কমে। নিচের ছকে NPK সারের মাত্রা দেখুন:
| ধানের ধরন | নাইট্রোজেন (কেজি/বিঘা) | ফসফরাস (কেজি/বিঘা) | পটাশিয়াম (কেজি/বিঘা) |
| বোরো | ১৬-১৮ | ৫-৬ | ৮-১০ |
| আমন | ১২-১৪ | ৪-৫ | ৬-৮ |
| আউশ | ১০-১২ | ৩-৪ | ৫-৬ |
NPK সার বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। সঠিক মাত্রায় দিলে ফলন ভালো হয়।
বোরো ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি
বোরো ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি একটু বেশি মনোযোগ চায়। কারণ বোরো ধান শীতকালে হয়। এই সময় গাছের বৃদ্ধি একটু ধীরে হয়। তাই বেশি সার দরকার হয়। বোরো ধানে প্রতি বিঘায় ইউরিয়া ২৮-৩০ কেজি, টিএসপি ১০-১২ কেজি এবং এমওপি ১০-১২ কেজি দিতে হয়। জিংক সালফেট ২ কেজি দিতে হয়। ইউরিয়া তিন ভাগে দিতে হয়। প্রথম ভাগ চারা লাগানোর ১০ দিন পর। দ্বিতীয় ভাগ ৩০ দিন পর। তৃতীয় ভাগ ৫০ দিন পর। বোরো মৌসুমে ঠান্ডায় সার একটু দেরিতে কাজ করে। তাই সময়মতো দেওয়া জরুরি।
আমন ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি
আমন ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি বোরোর থেকে আলাদা। আমন ধান বর্ষাকালে হয়। বৃষ্টির পানিতে অনেক সার ধুয়ে যায়। তাই একসাথে বেশি সার না দিয়ে ভাগে দেওয়া ভালো। আমন ধানে প্রতি বিঘায় ইউরিয়া ২০-২২ কেজি দিতে হয়। টিএসপি ৮-১০ কেজি এবং এমওপি ৮-১০ কেজি দিতে হয়। বৃষ্টির পরে সার দেওয়া ভালো। বৃষ্টির আগে দিলে সার ধুয়ে যায়। জমিতে পানি বেশি থাকলে সার দেওয়া ঠিক না। পানি কিছুটা কমলে তখন সার দিন।
আউশ ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি
আউশ ধানে সার প্রয়োগ পদ্ধতি একটু সহজ। আউশ ধান গ্রীষ্মকালে হয়। এই মৌসুমে বৃষ্টি থাকে। আবার গরমও থাকে। আউশ ধানে সারের চাহিদা তুলনামূলক কম। প্রতি বিঘায় ইউরিয়া ১৬-১৮ কেজি দিতে হয়। টিএসপি ৬-৮ কেজি এবং এমওপি ৬-৮ কেজি দিতে হয়। ইউরিয়া দুই ভাগে দিলেও চলে। প্রথম ভাগ চারা লাগানোর ১৫ দিন পর। দ্বিতীয় ভাগ ৩৫ দিন পর। আউশ ধানে জৈব সার বেশি দিলে ভালো ফলন হয়। কম রাসায়নিক সারে কাজ হয়।
ধানের জমিতে সার দেওয়ার সঠিক সময়
ধানের জমিতে সার দেওয়ার সঠিক সময় জানাটা খুব দরকার। ভুল সময়ে সার দিলে লাভ হয় না। বরং ক্ষতি হতে পারে।
- জমি তৈরির সময়: টিএসপি, এমওপি এবং জিংক সার দিন। মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।
- চারা লাগানোর ৭-১০ দিন পর: প্রথম কিস্তি ইউরিয়া দিন। গাছ মাটিতে শিকড় ধরলে তারপর দিন।
- চারা লাগানোর ২৫-৩০ দিন পর: দ্বিতীয় কিস্তি ইউরিয়া দিন। এই সময় গাছ দ্রুত বাড়ে।
- চারা লাগানোর ৪০-৫০ দিন পর: তৃতীয় কিস্তি ইউরিয়া দিন। থোড় আসার আগে এই সার দিন।
সন্ধ্যার দিকে সার দেওয়া সবচেয়ে ভালো। দুপুরে রোদের সময় সার দিলে নষ্ট হয়ে যায়।
ধানের জমিতে কত কেজি সার লাগে
ধানের জমিতে কত কেজি সার লাগে তা নির্ভর করে মাটির উপর। আর ধানের জাতের উপরও নির্ভর করে। তবে একটি সাধারণ হিসাব দেওয়া যায়। উচ্চ ফলনশীল জাতে বেশি সার লাগে। দেশি জাতে কম সার লাগে। গড়ে প্রতি বিঘায় ইউরিয়া ২০-৩০ কেজি, টিএসপি ৮-১২ কেজি এবং এমওপি ৮-১২ কেজি লাগে। মাটি পরীক্ষা করলে আরও সঠিক হিসাব পাওয়া যায়। উপজেলা কৃষি অফিস থেকেও পরামর্শ নেওয়া যায়। তারা বিনামূল্যে সাহায্য করেন।
ধান চাষে সার প্রয়োগের মাত্রা
ধান চাষে সার প্রয়োগের মাত্রা সঠিক রাখা জরুরি। কম দিলে ফলন কমে। বেশি দিলে টাকা নষ্ট হয়। গাছেরও ক্ষতি হয়। নিচের ছকে বিভিন্ন ধানের জন্য সারের মাত্রা দেওয়া হলো:
| ধানের ধরন | ইউরিয়া (কেজি/বিঘা) | টিএসপি (কেজি/বিঘা) | এমওপি (কেজি/বিঘা) | জিংক (কেজি/বিঘা) |
| বোরো উফশী | ২৮-৩০ | ১০-১২ | ১০-১২ | ২ |
| আমন উফশী | ২০-২২ | ৮-১০ | ৮-১০ | ১.৫ |
| আউশ উফশী | ১৬-১৮ | ৬-৮ | ৬-৮ | ১ |
| দেশি জাত | ১২-১৫ | ৫-৬ | ৫-৬ | ১ |
এই মাত্রা মেনে চললে ফলন ভালো হয়। মাটির অবস্থা বুঝে সামান্য কম বা বেশি করা যায়।
ধান চাষে জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম
ধান চাষে জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম অনেকে জানেন না। জৈব সার মাটিকে জীবন্ত রাখে। মাটির উর্বরতা বাড়ায়। রাসায়নিক সারের চাহিদা কমায়। গোবর সার, কম্পোস্ট এবং সবুজ সার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। প্রতি বিঘায় ৮-১০ মণ গোবর সার দেওয়া ভালো। জমি চাষ দেওয়ার ১৫ দিন আগে গোবর সার ছিটিয়ে দিন। এতে সার পচে মাটিতে মিশে যাওয়ার সময় পাবে। জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে। পোকামাকড়ও কম হয়।
ধান চাষে রাসায়নিক সার ব্যবহারের নিয়ম
ধান চাষে রাসায়নিক সার ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলা দরকার। রাসায়নিক সার দ্রুত কাজ করে। কিন্তু বেশি ব্যবহার করলে মাটির ক্ষতি হয়। তাই পরিমাণমতো ব্যবহার করতে হবে। সার কেনার সময় ভালো দোকান থেকে কিনুন। নকল সার দিলে ফলন হয় না। সার দেওয়ার আগে জমিতে পানি রাখুন। সার দেওয়ার পরও পানি রাখুন। এতে সার মাটিতে ভালো মিশে। রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারও দিন। দুটো একসাথে দিলে সবচেয়ে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
ধানের ফলন বাড়াতে কোন সার ব্যবহার করবেন
ধানের ফলন বাড়াতে কোন সার ব্যবহার করবেন তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। সত্যি বলতে একটি সার দিয়ে ফলন বাড়ানো যায় না। সুষম সার ব্যবস্থাপনাই আসল চাবিকাঠি।
- ইউরিয়া সার গাছকে সবুজ ও শক্তিশালী করে। দানা ভারী হয়।
- টিএসপি শিকড় মজবুত করে এবং থোড় তাড়াতাড়ি আসে।
- এমওপি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং দানার মান ভালো করে।
- জিংক সার ধানের বাড়তি ফলন দেয় এবং চিটা কমায়।
- জৈব সার দিলে মাটির গুণ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফলন বাড়ে।
সব সার মিলিয়ে দিলেই সবচেয়ে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
ধান গাছে সার দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
ধান গাছে সার দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি জানলে অনেক সুবিধা হয়। অনেকে সার হাত দিয়ে ছিটিয়ে দেন। এটি ভালো পদ্ধতি। কিন্তু সমানভাবে ছিটাতে হবে। এক জায়গায় বেশি দিলে গাছ পুড়ে যেতে পারে। সার দেওয়ার সময় জমিতে ২-৩ সেন্টিমিটার পানি রাখুন। সার দেওয়ার পর ৩-৪ দিন পানি বের করবেন না। পানি বের করলে সারও বের হয়ে যায়। বিকেলে বা সন্ধ্যায় সার দিন। সকালে শিশির থাকলে সার গাছের পাতায় লেগে ক্ষতি করতে পারে।
ধান চাষে ইউরিয়া টপ ড্রেসিং পদ্ধতি
ধান চাষে ইউরিয়া টপ ড্রেসিং পদ্ধতি মানে হলো গাছের উপর সার দেওয়া। এই পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় ইউরিয়া ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এটি বেশ কার্যকর পদ্ধতি। গাছ দ্রুত সার শোষণ করতে পারে। টপ ড্রেসিং সবসময় জমিতে পানি থাকা অবস্থায় করতে হয়। পানি ছাড়া টপ ড্রেসিং করলে ইউরিয়া উড়ে যায়। ভোরবেলা বা সন্ধ্যায় করা সবচেয়ে ভালো। বৃষ্টির আগে করলে সার ধুয়ে যায়। বৃষ্টির পরে করলে সবচেয়ে ভালো কাজ হয়।
ধানের জমিতে ডিএপি সার ব্যবহার
ধানের জমিতে ডিএপি সার ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ডিএপি মানে ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট। এতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস দুটোই থাকে। তাই আলাদা করে ইউরিয়া ও টিএসপি কম লাগে। ডিএপি জমি তৈরির সময় দিতে হয়। প্রতি বিঘায় ১০-১২ কেজি দিলে ভালো হয়। ডিএপি ব্যবহার করলে টিএসপির প্রয়োজন কমে যায়। তবে পরে ইউরিয়া একটু কম দিলেই চলে। ডিএপি মাটিতে দ্রুত মিশে যায়। শিকড়ের বৃদ্ধি ভালো হয়।
ধান চাষে সুষম সার ব্যবস্থাপনা
ধান চাষে সুষম সার ব্যবস্থাপনা মানে হলো সব ধরনের পুষ্টি সঠিক পরিমাণে দেওয়া। শুধু ইউরিয়া দিলে চলবে না। শুধু টিএসপি দিলেও চলবে না। সব সার একসাথে দিতে হবে। এতে গাছ সুস্থ থাকে। রোগবালাই কম হয়। ফলনও বাড়ে। সুষম সার ব্যবস্থাপনায় মাটি পরীক্ষা খুব জরুরি। মাটির কোন পুষ্টি কম সেটা জেনে দিলে খরচ কমে। বেশি সার না দিয়ে সঠিক পরিমাণে দিন। এতে পরিবেশও ভালো থাকে।
ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা গাইড
ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা গাইড হিসেবে কয়েকটি মূল বিষয় মনে রাখুন। প্রথমত, মাটি পরীক্ষা করুন। দ্বিতীয়ত, সঠিক সার বেছে নিন। তৃতীয়ত, সঠিক সময়ে সার দিন। চতুর্থত, সঠিক পরিমাণে সার দিন। পঞ্চমত, জৈব ও রাসায়নিক সার একসাথে ব্যবহার করুন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিন। তারা আপনার এলাকার মাটি সম্পর্কে ভালো জানেন। উপজেলা কৃষি অফিসে গেলে বিনামূল্যে পরামর্শ পাওয়া যায়। অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকেও শিখতে পারেন।
ধানের জমিতে সার প্রয়োগের সময়সূচি
ধানের জমিতে সার প্রয়োগের সময়সূচি একটি নির্দিষ্ট ছকে দেওয়া যায়। এই ছক অনুসরণ করলে কোনো সার মিস হবে না।
| সময় | কোন সার | পরিমাণ (প্রতি বিঘা) |
| জমি তৈরির সময় | টিএসপি + এমওপি + জিংক | ১০+১০+২ কেজি |
| চারা লাগানোর ১০ দিন পর | ইউরিয়া (১ম কিস্তি) | মোটের ১/৩ ভাগ |
| চারা লাগানোর ৩০ দিন পর | ইউরিয়া (২য় কিস্তি) | মোটের ১/৩ ভাগ |
| চারা লাগানোর ৫০ দিন পর | ইউরিয়া (৩য় কিস্তি) | মোটের ১/৩ ভাগ |
এই সময়সূচি মেনে চললে ধানের ফলন ভালো হবে। কোনো ধাপ বাদ দেবেন না।
ধানের চারা রোপণের পর সার প্রয়োগ
ধানের চারা রোপণের পর সার প্রয়োগ করা হয় নির্দিষ্ট সময় পর পর। চারা লাগানোর সাথে সাথে সার দেওয়া ঠিক না। চারা আগে মাটিতে শিকড় ধরুক। তারপর সার দিন। সাধারণত চারা লাগানোর ৭ থেকে ১০ দিন পর প্রথম সার দিতে হয়। এই সময় প্রথম কিস্তি ইউরিয়া দিন। গাছ সবুজ হয়ে উঠবে। দ্রুত বাড়বে। চারা যদি হলুদ হয়ে যায় তাহলে বুঝবেন নাইট্রোজেনের অভাব। সেক্ষেত্রে দ্রুত ইউরিয়া দিন। গাছ আবার সবুজ হয়ে যাবে।
ধানের জন্য সেরা সার কোনটি
ধানের জন্য সেরা সার কোনটি এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ একটি সার দিয়ে সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না।
- সবচেয়ে জরুরি সার: ইউরিয়া। কারণ নাইট্রোজেন ছাড়া গাছ বাড়ে না।
- দ্বিতীয় জরুরি সার: টিএসপি বা ডিএপি। শিকড় মজবুত করে।
- তৃতীয় জরুরি সার: এমওপি। রোগ থেকে রক্ষা করে।
- বিশেষ সার: জিংক সালফেট। চিটা কমায় এবং ফলন বাড়ায়।
এই চারটি সার একসাথে দিলে সবচেয়ে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পাশাপাশি জৈব সার দিলে মাটি ভালো থাকে।
ধান চাষে সার কম দিলে কী হয়
ধান চাষে সার কম দিলে কী হয় তা না জানলে ক্ষতি হতে পারে। সার কম দিলে গাছ ঠিকমতো বাড়তে পারে না। পাতা হলুদ হয়ে যায়। গাছ দুর্বল হয়। রোগ ও পোকার আক্রমণ বাড়ে। থোড় কম আসে। দানা ছোট হয়। চিটার পরিমাণ বাড়ে। ফলন অনেক কমে যায়। কৃষকের লোকসান হয়। তাই সার কম না দিয়ে সঠিক পরিমাণে দিন। সার কিনতে টাকা লাগলেও ফলন বেশি হলে সেই টাকা উঠে আসে। সার দেওয়া আসলে একটি বিনিয়োগ।
ধান চাষে অতিরিক্ত সার দিলে ক্ষতি
ধান চাষে অতিরিক্ত সার দিলে ক্ষতি হয়। অনেকে মনে করেন বেশি সার দিলে বেশি ফলন হবে। কিন্তু এটি ভুল ধারণা। বেশি ইউরিয়া দিলে গাছের পাতা পুড়ে যায়। গাছ লম্বা হয়ে পড়ে যায়। রোগবালাই বাড়ে। বেশি ফসফরাস দিলে জিংকের অভাব হয়। মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হয়। পানি ও মাটি দূষিত হয়। পরিবেশের ক্ষতি হয়। তাই সঠিক পরিমাণে সার দিন। বেশি না, কম না। ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকু দিন।
ধান চাষে জিংক সার প্রয়োগ
ধান চাষে জিংক সার প্রয়োগ করলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বাংলাদেশের অনেক জমিতে জিংকের অভাব আছে। জিংকের অভাবে ধান গাছের পাতায় বাদামি বা মরচে রঙের দাগ পড়ে। চারা দুর্বল হয়। থোড় কম আসে। চিটা বাড়ে। জিংক সালফেট সার ব্যবহার করলে এই সমস্যা সমাধান হয়। প্রতি বিঘায় ১.৫ থেকে ২ কেজি জিংক সালফেট দিতে হয়। জমি তৈরির সময় অন্যান্য সারের সাথে মিশিয়ে দিন। জিংক সার প্রতি মৌসুমে না দিয়ে এক মৌসুম পরপর দিলেও চলে।
ধান চাষে বোরন সার ব্যবহারের নিয়ম
ধান চাষে বোরন সার ব্যবহারের নিয়ম অনেকে জানেন না। বোরন একটি অনুপুষ্টি। কিন্তু এর অভাবে ধানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বোরনের অভাবে ধানের শীষে দানা হয় না। চিটার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। পাতার আগা সাদা হয়ে যায়। বোরিক এসিড সার ব্যবহার করলে বোরনের অভাব দূর হয়। প্রতি বিঘায় ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি বোরিক এসিড দিলে যথেষ্ট। জমি তৈরির সময় দিন। অথবা পানিতে গুলিয়ে স্প্রে করা যায়। বোরনের অভাব থাকলে ফলন ২০-৩০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ধান চাষে আধুনিক সার প্রয়োগ পদ্ধতি

ধান চাষে আধুনিক সার প্রয়োগ পদ্ধতি এখন অনেক কৃষক ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে একটি হলো লিফ কালার চার্ট বা এলসিসি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে পাতার রঙ দেখে সার দেওয়া হয়। পাতা হলুদ হলে বুঝতে হবে ইউরিয়া দরকার। পাতা গাড় সবুজ হলে সার দেওয়ার দরকার নেই। এই পদ্ধতিতে ইউরিয়া কম লাগে। খরচ কমে। আরেকটি আধুনিক পদ্ধতি হলো মাটি পরীক্ষা করে সার দেওয়া। এতে অপ্রয়োজনীয় সার দেওয়া লাগে না।
ধান চাষে সার ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ গাইড
ধান চাষে সার ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ গাইড অনুসরণ করলে আপনি একজন সফল কৃষক হতে পারবেন। প্রথমে জমির মাটি পরীক্ষা করুন। মাটির ধরন ও পুষ্টির অবস্থা জানুন। তারপর ধানের জাত বেছে নিন। উফশী জাতে বেশি সার লাগে। দেশি জাতে কম লাগে। সার কেনার সময় বিশ্বস্ত দোকান থেকে কিনুন। নকল সার থেকে সাবধান থাকুন। সময়মতো সার দিন। পরিমাণমতো দিন। জৈব ও রাসায়নিক সার একসাথে ব্যবহার করুন। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে ফলন বাড়বে। খরচও কমবে।
কৃষি বিষয়ক আরও পোস্ট দেখতে
👉 কৃষি ক্যাটাগরি দেখুন।
উপসংহার
ধান চাষে সার প্রয়োগ শুধু একটি কাজ নয়, এটি একটি দক্ষতা। সঠিক সার, সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে দিলে ফলন অনেক বাড়ানো সম্ভব। অনেক কৃষক না জেনে বেশি টাকা খরচ করেন। কিন্তু ফলন পান কম। এই লেখাটি পড়ার পর আপনি জানলেন কোন সার কখন দিতে হয়। কতটুকু দিতে হয়। কীভাবে দিতে হয়। এখন এই জ্ঞান কাজে লাগান। আপনার জমিতে পরীক্ষা করুন। কৃষি অফিসের সাহায্য নিন। আশা করি এবার আপনার ধানের ফলন আগের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
ধান চাষে কোন সার সবচেয়ে বেশি দরকার?
ইউরিয়া সার সবচেয়ে বেশি দরকার। এটি গাছকে সবুজ রাখে এবং দ্রুত বাড়তে সাহায্য করে। তবে শুধু ইউরিয়া দিলে চলবে না। টিএসপি, এমওপি ও জিংকও দিতে হবে।
ধানের জমিতে কতবার ইউরিয়া দিতে হয়?
ইউরিয়া তিন কিস্তিতে দিতে হয়। চারা লাগানোর ১০, ৩০ এবং ৫০ দিন পর। একসাথে সব ইউরিয়া দেওয়া ঠিক না।
বোরো ও আমন ধানে সারের পার্থক্য কী?
বোরো ধানে বেশি সার লাগে। আমন ধানে কম লাগে। বোরো মৌসুমে ঠান্ডায় সার কাজ করতে দেরি হয়। তাই সময়মতো দেওয়া জরুরি।
জৈব সার কি রাসায়নিক সারের বিকল্প?
না। জৈব সার রাসায়নিক সারের বিকল্প নয়। তবে দুটো একসাথে দিলে সবচেয়ে ভালো ফলন হয়। জৈব সার মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
সার দেওয়ার পর জমিতে পানি রাখতে হবে কেন?
পানি থাকলে সার মাটিতে ভালোভাবে মিশে যায়। গাছ সহজে সার নিতে পারে। পানি না থাকলে ইউরিয়া বাতাসে উড়ে যায়।
ধান গাছের পাতা হলুদ হলে কী করবেন?
পাতা হলুদ মানে নাইট্রোজেনের অভাব। দ্রুত ইউরিয়া সার দিন। ২-৩ দিনের মধ্যে গাছ আবার সবুজ হয়ে যাবে।
ধান চাষে জিংক সার কেন দিতে হয়?
জিংকের অভাবে চিটা বাড়ে এবং ফলন কমে। জিংক সালফেট দিলে এই সমস্যা দূর হয়। প্রতি বিঘায় ১.৫-২ কেজি দিলেই যথেষ্ট।
মাটি পরীক্ষা কোথায় করাবেন?
উপজেলা কৃষি অফিসে বা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে মাটি পরীক্ষা করানো যায়। খরচ খুবই কম। এতে সঠিক পরিমাণে সার দেওয়া সম্ভব হয়।
বৃষ্টির আগে সার দিলে কি ক্ষতি হয়?
হ্যাঁ, ক্ষতি হয়। বৃষ্টির আগে সার দিলে বৃষ্টির পানিতে সার ধুয়ে যায়। গাছ সার পায় না। টাকা নষ্ট হয়। তাই সবসময় বৃষ্টির পরে সার দিন। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তখন দিন।
ধান কাটার কতদিন আগে সার দেওয়া বন্ধ করতে হয়?
ধান কাটার অন্তত ৩০ দিন আগে সার দেওয়া বন্ধ করতে হয়। থোড় আসার পর আর ইউরিয়া দেওয়া ঠিক না। এতে দানার মান খারাপ হয় এবং গাছ পড়ে যেতে পারে।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍






