মহাকাশের গভীরে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত শক্তি। এর নাম ব্লাক হোল। এটি এমন এক জায়গা যেখানে আলোও পালাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা বলেন, ব্লাক হোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু। আজ আমরা এই অবিশ্বাস্য বিষয় নিয়ে সহজ ভাষায় জানব। চলুন শুরু করা যাক।
ব্লাক হোল কী
ব্লাক হোল হলো মহাকাশের এমন একটি জায়গা যার টানা শক্তি অসীম। এটি এত শক্তিশালী যে কিছুই পালাতে পারে না। এমনকি আলোও এর ভেতর আটকে যায়। তাই একে কালো গহ্বর বলা হয়।
মহাকাশে যখন একটি বড় নক্ষত্র মারা যায়, তখন এটি তৈরি হয়। নক্ষত্রের কেন্দ্র ভেঙে পড়ে এবং অসীম ঘনত্ব তৈরি করে। এই ঘনত্বের কারণে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক বেড়ে যায়। ফলে ব্লাক হোল জন্ম নেয়।
বিজ্ঞানীরা একে দেখতে পান না সরাসরি। কারণ এটি কোনো আলো ছাড়ে না। তবে এর চারপাশের জিনিস দেখে বোঝা যায়। যেমন গ্যাস বা নক্ষত্র যখন এর দিকে টানা হয়। তখন এক্স-রে নির্গত হয় যা বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেন।
ব্লাক হোল কিভাবে সৃষ্টি হয়

ব্লাক হোল তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এটি শুরু হয় একটি বড় নক্ষত্রের মৃত্যু দিয়ে। নক্ষত্র যখন তার সব হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ করে, তখন এর কেন্দ্র সঙ্কুচিত হতে থাকে। এই সঙ্কোচন প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।
একসময় নক্ষত্রের বাইরের স্তর বিস্ফোরিত হয়ে যায়। এটি একটি সুপারনোভা ঘটনা। বিস্ফোরণের পর কেন্দ্র আরও সঙ্কুচিত হয়। যদি এর ভর যথেষ্ট বেশি হয়, তাহলে সঙ্কোচন থামে না। কেন্দ্র একটি বিন্দুতে পরিণত হয়।
এই বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। এর ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও অসীম হয়। এভাবেই একটি ব্লাক হোল জন্ম নেয়। পুরো প্রক্রিয়া কয়েক সেকেন্ডেই ঘটে যেতে পারে।
ব্লাক হোল অর্থ কী
ব্লাক হোল শব্দের অর্থ হলো কালো গহ্বর বা কালো গর্ত। ইংরেজিতে ‘ব্লাক’ মানে কালো এবং ‘হোল’ মানে গর্ত। এটি এমন নামকরণ করা হয়েছে কারণ এটি সব কিছু গিলে খায়। এমনকি আলোও এর ভেতর থেকে বের হতে পারে না।
১৯৬৭ সালে বিজ্ঞানী জন হুইলার এই নাম দেন। আগে এটিকে বলা হতো ‘ফ্রোজেন স্টার’। কিন্তু ব্লাক হোল নামটি বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখন পুরো বিশ্বে এই নামে পরিচিত।
মহাকাশে এটি একটি অদৃশ্য দানব হিসেবে কাজ করে। যা কিছু তার কাছে আসে, সবই টেনে নেয়। এর কোনো তল নেই, কোনো শেষ নেই। তাই একে গহ্বর বা গর্ত বলা হয়।
ব্লাক হোল কাকে বলে
যে বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি যে আলোও পালাতে পারে না, তাকে ব্লাক হোল বলে। এটি মহাকাশের এমন এক অঞ্চল যেখানে স্থান এবং সময় বিকৃত হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায়, এটি একটি মহাকাশীয় সিঙ্গুলারিটি।
নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি শেষ করে ফেলে, তখন বিস্ফোরণ ঘটে। একে বলা হয় সুপারনোভা। এই বিস্ফোরণের পর যদি নক্ষত্রের ভর যথেষ্ট থাকে, তাহলে ব্লাক হোল তৈরি হয়। সাধারণত সূর্যের তিন গুণ বেশি ভর দরকার।
- কালো গর্ত যার ভেতর সবকিছু হারিয়ে যায়
- আলো পর্যন্ত বের হতে পারে না এমন জায়গা
- মহাকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র
- সময় ও স্থান যেখানে থেমে যায়
এটি মহাবিশ্বের এমন এক ধাঁধা যা আজও বিজ্ঞানীদের ভাবায়। প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য বের হচ্ছে। কিন্তু এখনও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে।
ব্লাক হোলের কাজ কী
ব্লাক হোলের প্রধান কাজ হলো তার চারপাশের সবকিছু টেনে নেওয়া। এটি একটি মহাজাগতিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো কাজ করে। যা কিছু ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে ঢোকে, তা আর ফেরত আসে না। ইভেন্ট হরাইজন হলো ব্লাক হোলের সীমানা।
এটি আশেপাশের গ্যাস এবং ধুলো টেনে নেয়। এমনকি নক্ষত্রও গিলে খেতে পারে। যখন বস্তু ব্লাক হোলের দিকে টানা হয়, তখন প্রচণ্ড ঘর্ষণ হয়। এই ঘর্ষণে প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। এক্স-রে এবং গামা রশ্মি বের হয়।
ব্লাক হোল মহাকাশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও একটি সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল আছে। এটি গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলোকে ধরে রাখে। তাই এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্লাক হোলের ভেতরে কী থাকে
ব্লাক হোলের ভেতরে কী আছে তা কেউ জানে না নিশ্চিতভাবে। কারণ সেখান থেকে কোনো তথ্য বের হয় না। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, কেন্দ্রে সিঙ্গুলারিটি থাকে। এটি অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দু। এখানে পদার্থবিজ্ঞানের সব নিয়ম ভেঙে যায়।
যা কিছু ব্লাক হোলে পড়ে, তা সিঙ্গুলারিটিতে চলে যায়। সেখানে সবকিছু চূর্ণ হয়ে একদম ছোট হয়ে যায়। এটম এবং কণাও টিকে থাকতে পারে না। সব কিছু এক বিন্দুতে জমা হয়।
- সিঙ্গুলারিটি যেখানে ঘনত্ব অসীম
- সময় থেমে যাওয়ার জায়গা
- কোনো আলো বা তথ্য বের হয় না
- সব পদার্থ চূর্ণ হয়ে যায়
কিছু তত্ত্ব বলে, ব্লাক হোল অন্য মহাবিশ্বের দরজা হতে পারে। তবে এটি শুধুই অনুমান। এখনও প্রমাণ মেলেনি। তাই ব্লাক হোলের ভেতর সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে আছে।
ব্লাক হোলের রহস্য
ব্লাক হোল নিয়ে অনেক রহস্য আছে যা এখনও সমাধান হয়নি। প্রথম রহস্য হলো তথ্যের হারিয়ে যাওয়া। যখন কিছু ব্লাক হোলে পড়ে, তার সব তথ্য হারিয়ে যায় কিনা? স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, তথ্য হারায় না। কিন্তু কীভাবে সংরক্ষিত থাকে তা অজানা।
দ্বিতীয় রহস্য হলো হকিং রেডিয়েশন। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ব্লাক হোল থেকে কণা নির্গত হয়। এটি ধীরে ধীরে ব্লাক হোলকে ছোট করে। কিন্তু এখনও এটি পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। তাই প্রমাণ নেই।
তৃতীয় রহস্য হলো সিঙ্গুলারিটির প্রকৃতি। এই বিন্দুতে কী ঘটে? এখানে সময় এবং স্থান কীভাবে কাজ করে? কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এখানে মিলে না। নতুন পদার্থবিজ্ঞান দরকার এর উত্তরের জন্য।
| রহস্য | বিবরণ | বর্তমান অবস্থা |
| তথ্য প্যারাডক্স | তথ্য হারায় কিনা | অমীমাংসিত |
| হকিং রেডিয়েশন | কণা নির্গমন | অপ্রমাণিত |
| সিঙ্গুলারিটি | কেন্দ্রের প্রকৃতি | অজানা |
| ওয়ার্মহোল | অন্য মহাবিশ্ব | তাত্ত্বিক |
এছাড়া আরও অনেক প্রশ্ন আছে। ব্লাক হোল কি সময় ভ্রমণের পথ? এটি কি অন্য মাত্রার প্রবেশদ্বার? বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো একদিন উত্তর মিলবে।
ব্লাক হোল কি বিপজ্জনক
হ্যাঁ, ব্লাক হোল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে শুধুমাত্র যারা কাছে যায় তাদের জন্য। এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত প্রবল যে সবকিছু ছিঁড়ে ফেলে। একে বলা হয় স্প্যাগেটিফিকেশন। যেন আপনাকে স্প্যাগেটির মতো টেনে লম্বা করা হচ্ছে।
যদি কোনো মহাকাশযান ব্লাক হোলের কাছে যায়, তাহলে বিপদ। মহাকর্ষীয় টান এত শক্তিশালী যে যান ভেঙে যাবে। মহাকাশচারীরাও বাঁচবে না। তাদের শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তাই ব্লাক হোল থেকে নিরাপদ দূরত্ব রাখা জরুরি।
তবে দূর থেকে এটি নিরাপদ। আমাদের পৃথিবীর কাছে কোনো ব্লাক হোল নেই। সবচেয়ে কাছের ব্লাক হোল হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে। তাই পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি নেই। আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ব্লাক হোলে পড়লে কী হয়
ব্লাক হোলে পড়লে আপনার অস্তিত্ব শেষ। প্রথমে আপনি ইভেন্ট হরাইজনে পৌঁছাবেন। এটি ব্লাক হোলের সীমানা। এখানে পৌঁছালে ফেরা অসম্ভব। আপনি ভেতরের দিকে টানা হতে থাকবেন।
- স্প্যাগেটিফিকেশন শুরু হবে আপনার শরীরে
- মাথা এবং পা দুই দিকে টানা হবে
- শরীর লম্বা হতে থাকবে ক্রমাগত
- অণু এবং পরমাণু আলাদা হয়ে যাবে
ধীরে ধীরে আপনি সিঙ্গুলারিটির দিকে এগোবেন। সময় ধীর হয়ে যাবে আপনার জন্য। কিন্তু বাইরের পর্যবেক্ষক দেখবে আপনি হিমায়িত হয়ে গেছেন। আপনি চিরকাল ইভেন্ট হরাইজনে আটকে আছেন বলে মনে হবে।
শেষ পর্যন্ত সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছে সবকিছু শেষ। আপনার শরীরের প্রতিটি অণু চূর্ণ হয়ে যাবে। কোনো চিহ্ন থাকবে না আপনার অস্তিত্বের। এভাবেই ব্লাক হোল সবকিছু গিলে খায়।
ব্লাক হোলের শক্তি কত
ব্লাক হোলের শক্তি প্রায় অসীম। এটি নির্ভর করে এর ভরের ওপর। যত বেশি ভর, তত বেশি শক্তি। একটি ছোট ব্লাক হোলও সূর্যের চেয়ে লক্ষ গুণ শক্তিশালী। সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল তো আরও বেশি।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি যে আলোর গতিও যথেষ্ট নয়। আলো যায় সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার গতিতে। কিন্তু তবুও পালাতে পারে না। এটি কল্পনাতীত শক্তি। পৃথিবীর কোনো শক্তির সাথে তুলনা হয় না।
ব্লাক হোল যখন দুটি জিনিস গিলে খায়, তখন শক্তি নির্গত করে। এক্স-রে এবং গামা রশ্মি বের হয়। এই শক্তি এত প্রবল যে লাখো আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এভাবেই ব্লাক হোল শনাক্ত করেন।
ব্লাক হোল কি পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর
না, ব্লাক হোল পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর নয়। কারণ কাছাকাছি কোনো ব্লাক হোল নেই। সবচেয়ে কাছের ব্লাক হোল অন্তত এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এক আলোকবর্ষ মানে আলো এক বছরে যতদূর যায়। এটি প্রায় দশ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
এত দূরত্বে থাকলে কোনো প্রভাব পড়ে না। ব্লাক হোলের মাধ্যাকর্ষণ এত দূর পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই পৃথিবী সম্পূর্ণ নিরাপদ। কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। মানুষের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
তবে যদি কখনও ব্লাক হোল কাছে আসে, তাহলে বিপদ। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ব্লাক হোল এলোমেলো ঘুরে বেড়ায় না। এটি তার কক্ষপথে থাকে। তাই পৃথিবীর জন্য কোনো চিন্তা নেই।
| প্রশ্ন | উত্তর | কারণ |
| ব্লাক হোল কি পৃথিবীকে গিলবে? | না | অনেক দূরে অবস্থিত |
| কাছের ব্লাক হোল কতদূর? | ১০০০+ আলোকবর্ষ | নিরাপদ দূরত্ব |
| ভবিষ্যতে বিপদ আছে? | না | কক্ষপথ স্থিতিশীল |
| পৃথিবী কি টানা হবে? | না | প্রভাব পৌঁছায় না |
বিজ্ঞানীরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন। যদি কোনো ব্লাক হোল কাছে আসে, আগেই জানা যাবে। তবে এমন ঘটনার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। তাই আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারি।
ব্লাক হোলের ভর কত
ব্লাক হোলের ভর বিভিন্ন রকম হতে পারে। ছোট ব্লাক হোল সূর্যের তিন গুণ ভারী। এগুলোকে বলা হয় স্টেলার ব্লাক হোল। এগুলো একটি নক্ষত্রের মৃত্যুতে তৈরি হয়। সাধারণত পাঁচ থেকে কয়েকশ সৌর ভর হয়।
মাঝারি ব্লাক হোল কয়েক হাজার সৌর ভরের। এগুলো বিরল এবং কম পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা এখনও এদের উৎস ভালোভাবে বোঝেননি। হয়তো অনেক নক্ষত্র একসাথে মিলে তৈরি হয়।
সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল লাখ থেকে কোটি সৌর ভরের। এগুলো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে। আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে যে ব্লাক হোল, তার ভর চল্লিশ লাখ সূর্যের সমান। কিছু গ্যালাক্সিতে আরও বড় আছে।
ব্লাক হোলের তাপমাত্রা
ব্লাক হোলের তাপমাত্রা খুবই কম। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ব্লাক হোল তাপ বিকিরণ করে। একে বলা হয় হকিং রেডিয়েশন। তবে এই তাপ অত্যন্ত নগণ্য। প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
একটি সৌর ভরের ব্লাক হোলের তাপমাত্রা শূন্যের উপরে মাত্র কয়েক ন্যানো কেলভিন। এটি মহাবিশ্বের পটভূমি তাপমাত্রার চেয়েও কম। তাই ব্লাক হোল আসলে ঠান্ডা, গরম নয়। যত বড় ব্লাক হোল, তত কম তাপমাত্রা।
সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল প্রায় হিমায়িত। এর তাপমাত্রা শূন্যের খুব কাছাকাছি। এত কম তাপ যে পরিমাপ করাও কঠিন। তবে চারপাশের গ্যাস যখন এতে পড়ে, তখন লাখ ডিগ্রি গরম হয়ে যায়। তখন এক্স-রে বের হয়।
ব্লাক হোল কত বড় হতে পারে
ব্লাক হোল অনেক বড় হতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্লাক হোল হলো সুপারম্যাসিভ টাইপ। এগুলো কোটি সৌর ভর পর্যন্ত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দশ কোটি সৌর ভরও পাওয়া গেছে।
- TON 618 হলো সবচেয়ে বড় জানা ব্লাক হোল
- এর ভর প্রায় ছয় হাজার কোটি সূর্যের সমান
- এর আকার আমাদের পুরো সৌরজগতের চেয়ে বড়
- এটি পৃথিবী থেকে দশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে
এত বড় ব্লাক হোল কীভাবে তৈরি হয়, তা এখনও রহস্য। সম্ভবত কোটি কোটি বছর ধরে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। অন্য ব্লাক হোল এবং নক্ষত্র গিলে গিলে আকার বেড়েছে। এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আকারের কথা বললে, ইভেন্ট হরাইজন অনেক বড়। একটি বড় ব্লাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন কয়েক কোটি কিলোমিটার হতে পারে। এটি পুরো সৌরজগতকে গ্রাস করতে পারে। কল্পনা করা কঠিন এত বিশাল আকার।
ব্লাক হোলের ছবি
২০১৯ সালে প্রথম ব্লাক হোলের ছবি তোলা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। ছবিতে একটি কালো গোলক দেখা যায় চারপাশে উজ্জ্বল আলোর বলয়। এই আলো হলো ব্লাক হোলের চারপাশের উত্তপ্ত গ্যাস।
ছবিটি তোলা হয় M87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় ব্লাক হোলের। এটি পৃথিবী থেকে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ নামে একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার টেলিস্কোপের সমন্বয়।
২০২২ সালে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ব্লাক হোলের ছবিও প্রকাশ করা হয়। এর নাম Sagittarius A*। এই ছবিগুলো প্রমাণ করে ব্লাক হোল সত্যিই আছে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব সঠিক ছিল। বিজ্ঞানের জন্য এটি বিরাট সাফল্য।
ব্লাক হোলের নাম কী কী
ব্লাক হোলের অনেক নাম আছে বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। সবচেয়ে বিখ্যাত হলো Sagittarius A*। এটি আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। এর ভর চল্লিশ লাখ সৌর ভরের সমান। এটি পৃথিবী থেকে ছাব্বিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে।
Cygnus X-1 হলো প্রথম আবিষ্কৃত ব্লাক হোল। ১৯৬৪ সালে এক্স-রে দিয়ে শনাক্ত করা হয়। এটি একটি বাইনারি সিস্টেমের অংশ। একটি নক্ষত্রের সাথে জোড়া। এক্স-রে নির্গত করে প্রচুর।
| নাম | অবস্থান | ভর (সৌর ভর) | দূরত্ব |
| Sagittarius A* | মিল্কিওয়ে কেন্দ্র | ৪০ লাখ | ২৬,০০০ আলোকবর্ষ |
| Cygnus X-1 | সিগনাস নক্ষত্রমণ্ডল | ২১ | ৬,০০০ আলোকবর্ষ |
| M87* | M87 গ্যালাক্সি | ৬৫০ কোটি | ৫ কোটি আলোকবর্ষ |
| TON 618 | কোয়াসার | ৬৬০০ কোটি | ১০ কোটি আলোকবর্ষ |
আরও আছে V616 Monocerotis, GRS 1915+105 ইত্যাদি। প্রতিটি ব্লাক হোলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ব্লাক হোল খুঁজে পাচ্ছেন। প্রতিবছর তালিকা বাড়ছে।
প্রথম ব্লাক হোল কে আবিষ্কার করেন
ব্লাক হোলের ধারণা প্রথম দেন বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড। ১৯১৬ সালে তিনি আইনস্টাইনের সমীকরণ সমাধান করেন। সেখান থেকে ব্লাক হোলের গাণিতিক সম্ভাবনা বের হয়। তবে তখন একে কেউ বিশ্বাস করেনি।
প্রথম বাস্তব ব্লাক হোল আবিষ্কার করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ১৯৬৪ সালে। Cygnus X-1 নামে একটি এক্স-রে উৎস পাওয়া যায়। এটি খুব শক্তিশালী ছিল। বিজ্ঞানীরা বুঝলেন এটি ব্লাক হোল হতে পারে।
স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ ব্লাক হোল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তারা প্রমাণ করেন ব্লাক হোল সত্যিই সম্ভব। এজন্য পেনরোজ ২০২০ সালে নোবেল পুরস্কার পান। হকিং আগেই মারা গিয়েছিলেন।
ব্লাক হোল আবিষ্কার কবে হয়
ব্লাক হোলের তত্ত্বীয় আবিষ্কার হয় ১৯১৬ সালে। কার্ল শোয়ার্জশিল্ড আইনস্টাইনের সমীকরণ সমাধান করেন। সেখান থেকে এমন বস্তুর ধারণা আসে যেখান থেকে আলো পালাতে পারে না। তবে তখন একে ব্লাক হোল বলা হতো না।
১৯৬৭ সালে জন হুইলার ‘ব্লাক হোল’ নাম দেন। এই নাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে Cygnus X-1 কে প্রথম নিশ্চিত ব্লাক হোল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এক্স-রে পর্যবেক্ষণে এর প্রমাণ মেলে।
২০১৯ সালে প্রথম ব্লাক হোলের ছবি তোলা হয়। এটি ছিল সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ছবি দেখে সবাই নিশ্চিত হয় ব্লাক হোল সত্যি। এভাবে ধাপে ধাপে ব্লাক হোল আবিষ্কৃত হয়েছে।
ব্লাক হোল ও নক্ষত্রের সম্পর্ক
ব্লাক হোল এবং নক্ষত্রের গভীর সম্পর্ক আছে। নক্ষত্র থেকেই ব্লাক হোল জন্মায়। যখন একটি বড় নক্ষত্র মারা যায়, তখন ব্লাক হোল তৈরি হয়। নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের তিন গুণ বেশি হয়, তাহলে সম্ভাবনা থাকে।
নক্ষত্র তার জীবনে হাইড্রোজেন জ্বালায়। এই জ্বালানি শেষ হলে সংকোচন শুরু হয়। যদি নক্ষত্র যথেষ্ট বড় হয়, তাহলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর কেন্দ্র ভেঙে পড়ে। এভাবে ব্লাক হোল জন্ম নেয়।
কিছু ব্লাক হোল নক্ষত্রের সাথে জোড়া। একে বাইনারি সিস্টেম বলে। ব্লাক হোল নক্ষত্র থেকে গ্যাস টেনে নেয়। এই গ্যাস গরম হয়ে এক্স-রে ছাড়ে। বিজ্ঞানীরা এভাবে ব্লাক হোল খুঁজে পান। নক্ষত্র ছাড়া ব্লাক হোল খোঁজা অসম্ভব।
ব্লাক হোল কি মানুষকে টেনে নেয়
হ্যাঁ, ব্লাক হোল মানুষকে টেনে নেবে যদি কাছে যায়। তবে এটি ভুলভাবে বোঝা হয় অনেক সময়। ব্লাক হোল দূর থেকে মানুষ টানে না। শুধুমাত্র যারা খুব কাছে যায়, তাদেরই টানে। এটি একটি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো সর্বত্র চুষে নেয় না।
- ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে গেলেই টানা শুরু
- বাইরে থাকলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা যায়
- মাধ্যাকর্ষণ দূরত্বের সাথে কমে যায়
- সূর্যের জায়গায় ব্লাক হোল এলেও পৃথিবী ঠিক থাকবে
মহাকাশচারী যদি কখনও ব্লাক হোলের কাছে যায়, তাহলে বিপদ। তবে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই। কারণ সবচেয়ে কাছের ব্লাক হোল অনেক দূরে। মানুষের প্রযুক্তি এখনও সেখানে পৌঁছাতে পারে না। তাই মানুষ সম্পূর্ণ নিরাপদ।
তবে কল্পনা করলে, কেউ যদি কাছে যায়, তাহলে স্প্যাগেটিফিকেশন হবে। শরীর টেনে লম্বা হয়ে যাবে। শেষে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছে সব শেষ। কোনো উদ্ধার নেই। তাই ব্লাক হোল থেকে দূরে থাকাই ভালো।
ব্লাক হোল কি ধ্বংস করে
হ্যাঁ, ব্লাক হোল যা কিছু গিলে খায় তা ধ্বংস করে ফেলে। যে কোনো বস্তু ইভেন্ট হরাইজনে গেলে চূর্ণ হয়ে যায়। পরমাণু, অণু সব ভেঙে যায়। শেষে শুধু শক্তি রয়ে যায়। এভাবে ব্লাক হোল সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।
তবে ব্লাক হোল এলোমেলো ধ্বংস করে না। এটি শুধু যা তার কাছে আসে তাই টানে। দূরের জিনিসের ক্ষতি করে না। যেমন আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ব্লাক হোল আছে। কিন্তু পৃথিবী নিরাপদ। কারণ আমরা অনেক দূরে।
ব্লাক হোল নক্ষত্র ধ্বংস করতে পারে। যদি কোনো নক্ষত্র কাছে আসে, তাহলে টুকরো হয়ে যায়। একে বলা হয় টাইডাল ডিসরাপশন। নক্ষত্রের গ্যাস ব্লাক হোলে পড়ে। এক্স-রে নির্গত হয়। বিজ্ঞানীরা এমন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ব্লাক হোলের ভিতরে সময়
ব্লাক হোলের ভেতরে সময়ের ধারণা পাল্টে যায়। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, সময় মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ধীর হয়। ব্লাক হোলের কাছে গেলে সময় আরও ধীর হয়ে যায়। ইভেন্ট হরাইজনে সময় প্রায় থেমে যায়।
আপনি যদি ব্লাক হোলে পড়েন, আপনার জন্য সময় স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে আপনি হিমায়িত দেখাবে। আপনি ধীরে ধীরে ইভেন্ট হরাইজনের দিকে যাচ্ছেন বলে মনে হবে। কিন্তু কখনও পৌঁছাবেন না তাদের দৃষ্টিতে।
সিঙ্গুলারিটিতে সময়ের কোনো মানে নেই। সেখানে স্থান এবং সময় মিশে যায়। পদার্থবিজ্ঞানের সব নিয়ম ভেঙে যায়। তাই বলা যায় না সময় কীভাবে চলে। এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্য।
ব্লাক হোল কি শব্দ করে
ব্লাক হোল নিজে থেকে শব্দ করে না। কারণ মহাকাশে শব্দ ভ্রমণ করতে পারে না। শব্দের জন্য বাতাস বা মাধ্যম দরকার। মহাকাশ শূন্য, তাই শব্দ নেই। তবে ব্লাক হোলের কার্যকলাপ থেকে তরঙ্গ তৈরি হয়।
যখন দুটি ব্লাক হোল একে অপরকে ঘুরে, তখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়। এই তরঙ্গ স্থান-কালকে কাঁপায়। ২০১৫ সালে প্রথমবার এই তরঙ্গ শনাক্ত করা হয়। LIGO নামক যন্ত্র দিয়ে। এটি নোবেল পুরস্কার পায়।
বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে শব্দে রূপান্তর করেছেন। শোনা যায় অদ্ভুত এক আওয়াজ। এটি আসল শব্দ নয়, তবে ধারণা দেয়। ব্লাক হোল যখন একত্রিত হয়, তখন ‘চিরপ’ শব্দের মতো শোনায়। এভাবে ব্লাক হোলের ‘সংগীত’ শোনা যায়।
| ঘটনা | তরঙ্গ | শোনা শব্দ | আবিষ্কার |
| দুই ব্লাক হোল মিলন | মহাকর্ষীয় | চিরপ সাউন্ড | ২০১৫ |
| ব্লাক হোল ঘূর্ণন | স্পেসটাইম রিপল | কম্পন | চলমান |
| নক্ষত্র গ্রাস | এক্স-রে বার্স্ট | উচ্চ কম্পাঙ্ক | পর্যবেক্ষিত |
তাই বলা যায়, ব্লাক হোল সরাসরি শব্দ করে না। তবে এর কার্যকলাপ তরঙ্গ তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা সেই তরঙ্গ থেকে শব্দ বানান। এভাবে ব্লাক হোলের ‘কণ্ঠস্বর’ শোনা সম্ভব হয়।
ব্লাক হোল কত দূরে
সবচেয়ে কাছের ব্লাক হোল প্রায় এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এর নাম Gaia BH1। ২০২২ সালে আবিষ্কৃত হয়। এটি ওফিউকাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। তবে এখনও নিশ্চিত নয় সবচেয়ে কাছের কোনটি।
আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় ব্লাক হোল ছাব্বিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। Sagittarius A* নামে পরিচিত। এটি খুব বড় এবং শক্তিশালী। কিন্তু দূরত্বের কারণে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি করে না।
অন্য গ্যালাক্সির ব্লাক হোল লাখ বা কোটি আলোকবর্ষ দূরে। M87 গ্যালাক্সির ব্লাক হোল পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। এত দূরত্ব কল্পনা করা কঠিন। আলো সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার যায়। তবুও এত সময় লাগে পৌঁছাতে।
ব্লাক হোলের কেন্দ্র কী
ব্লাক হোলের কেন্দ্রে আছে সিঙ্গুলারিটি। এটি একটি বিন্দু যার ঘনত্ব অসীম। সব ভর এই এক বিন্দুতে জমা। এটি এত ছোট যে কোনো আকার নেই। কিন্তু ভর আছে অসীম। এটি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভাঙে।
সিঙ্গুলারিটিতে স্থান এবং সময় মিশে যায়। আর কোনো আলাদা ধারণা থাকে না। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অসীম হয়ে যায়। তাই সবকিছু এখানে চূর্ণ হয়ে যায়। পরমাণু, ইলেকট্রন কিছুই টিকে থাকে না।
বিজ্ঞানীরা এখনও সিঙ্গুলারিটি পুরোপুরি বোঝেননি। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এবং আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এখানে কাজ করে না। নতুন তত্ত্ব দরকার। হয়তো কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি এর উত্তর দেবে। তবে সেই তত্ত্ব এখনও সম্পূর্ণ নয়।
সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল কী
সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল হলো সবচেয়ে বড় ধরনের ব্লাক হোল। এদের ভর লাখ থেকে কোটি সৌর ভর। এগুলো প্রায় সব বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেও একটি আছে। এটি গ্যালাক্সিকে ধরে রাখে।
এত বড় ব্লাক হোল কীভাবে তৈরি হয়, তা এখনও রহস্য। সম্ভবত মহাবিশ্বের শুরুতেই তৈরি হয়েছিল। অথবা অনেক ছোট ব্লাক হোল মিলে বড় হয়েছে। কোটি কোটি বছরে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল গ্যালাক্সির গঠনে ভূমিকা রাখে। এটি নক্ষত্র তৈরি নিয়ন্ত্রণ করে। কখনও কখনও প্রচুর শক্তি নির্গত করে। একে কোয়াসার বলা হয়। কোয়াসার এত উজ্জ্বল যে কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখা যায়।
ব্লাক হোল বনাম নিউট্রন স্টার
ব্লাক হোল এবং নিউট্রন স্টার দুটোই মৃত নক্ষত্রের শেষ অবস্থা। তবে এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। নিউট্রন স্টার সৌর ভরের ১.৪ থেকে ৩ গুণ ভারী নক্ষত্র থেকে তৈরি হয়। ব্লাক হোল তিন সৌর ভরের বেশি থেকে।
নিউট্রন স্টারের একটি পৃষ্ঠ আছে। এটি নিউট্রন দিয়ে তৈরি। অত্যন্ত ঘন, কিন্তু সিঙ্গুলারিটি নয়। আলো এখান থেকে বের হতে পারে। তাই দেখা যায়। কিন্তু ব্লাক হোলের কোনো পৃষ্ঠ নেই। আলো পালাতে পারে না।
| বৈশিষ্ট্য | ব্লাক হোল | নিউট্রন স্টার |
| ভর | ৩+ সৌর ভর | ১.৪-৩ সৌর ভর |
| পৃষ্ঠ | নেই | আছে |
| আলো | নির্গত হয় না | নির্গত হয় |
| ঘনত্ব | অসীম | অত্যন্ত বেশি |
নিউট্রন স্টার ঘুরে এবং পালসার তৈরি করে। এটি রেডিও তরঙ্গ পাঠায়। ব্লাক হোল কিছু পাঠায় না। তবে চারপাশের গ্যাস থেকে এক্স-রে বের হয়। দুটোই মহাবিশ্বের অদ্ভুত বস্তু।
ব্লাক হোল সম্পর্কে সহজ ব্যাখ্যা
ব্লাক হোল বোঝা কঠিন মনে হলেও সহজভাবে বলা যায়। কল্পনা করুন একটি বড় তারকা মারা গেল। এর সব ভর একটি ছোট জায়গায় চাপা পড়ল। এত চাপ যে সবকিছু একদম ছোট বিন্দু হয়ে গেল। এই বিন্দুর টানা শক্তি এত বেশি যে আলোও পালাতে পারে না।
এটি একটি গর্তের মতো। কিন্তু সাধারণ গর্ত নয়। এটি স্থান-কালের গর্ত। যা এর কাছে আসে, সবই টেনে নেয়। এমনকি আলোও। তাই এটি কালো দেখায়। কিছু দেখা যায় না। শুধু চারপাশের জিনিস টানা হতে দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা বলেন, ব্লাক হোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস। এটি নক্ষত্র, গ্রহ সব গিলে খেতে পারে। তবে দূর থেকে নিরাপদ। আমরা পৃথিবীতে নিরাপদ কারণ কোনো ব্লাক হোল কাছে নেই। এভাবে সহজ করে বলা যায়।
ব্লাক হোল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মতামত
বিজ্ঞানীরা ব্লাক হোল নিয়ে অনেক মতামত দিয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন প্রথমে বিশ্বাস করতেন না ব্লাক হোল সম্ভব। তার তত্ত্ব থেকে এসেছিল, কিন্তু তিনি ভাবতেন প্রকৃতি এমন করবে না। পরে প্রমাণিত হয় তিনি ভুল ছিলেন।
স্টিফেন হকিং ব্লাক হোল নিয়ে বিখ্যাত কাজ করেছেন। তিনি বলেছিলেন ব্লাক হোল চিরকাল থাকে না। হকিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে যায়। তবে এটি এত ধীর যে কোটি কোটি বছর লাগবে।
রজার পেনরোজ ব্লাক হোলের গঠন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ব্লাক হোল অবশ্যম্ভাবী। বড় নক্ষত্র মরলে ব্লাক হোল হতেই হবে। এজন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। আধুনিক বিজ্ঞানীরা ব্লাক হোলকে সত্য বলে মানেন।
ব্লাক হোল সম্পর্কে অজানা তথ্য

ব্লাক হোল নিয়ে অনেক অজানা তথ্য আছে। প্রথম তথ্য হলো, ব্লাক হোল ঘুরে। এবং খুব দ্রুত ঘুরে। কিছু ব্লাক হোল সেকেন্ডে শত বার ঘোরে। এই ঘূর্ণন স্থান-কাল টেনে নিয়ে যায়। একে ফ্রেম ড্র্যাগিং বলে।
দ্বিতীয় তথ্য, ব্লাক হোলের কোনো চুল নেই। এর মানে ব্লাক হোল শুধু তিনটি জিনিস দিয়ে বর্ণনা করা যায়: ভর, ঘূর্ণন এবং চার্জ। অন্য কোনো তথ্য থাকে না। যা পড়ে তার সব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়।
তৃতীয় তথ্য, দুটি ব্লাক হোল মিলতে পারে। যখন মেলে, প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয় যা পুরো মহাবিশ্ব কাঁপায়। ২০১৫ সালে প্রথম এমন ঘটনা শনাক্ত হয়। এটি বিজ্ঞানের বড় সাফল্য।
- ব্লাক হোল থেকে জেট বের হয় কখনও কখনও
- এই জেট আলোর গতির কাছাকাছি চলে
- কিছু ব্লাক হোল মিলিয়ন ডিগ্রি তাপ তৈরি করে চারপাশে
- ব্লাক হোল সময় ভ্রমণের সম্ভাবনা দেয় তাত্ত্বিকভাবে
চতুর্থ তথ্য, ব্লাক হোল আসলে কালো নয়। চারপাশের আলো বাঁকিয়ে দেয়। একে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বলে। এভাবে পেছনের নক্ষত্র দেখা যায় বিকৃত হয়ে। বিজ্ঞানীরা এই প্রভাব দেখে ব্লাক হোল খুঁজে পান।
মহাকাশ সম্পর্কিত আরও পোস্ট দেখতে
👉 মহাকাশ ক্যাটাগরি দেখুন।
উপসংহার
ব্লাক হোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী বস্তু। এটি আমাদের বোঝাপড়া চ্যালেঞ্জ করে। পদার্থবিজ্ঞানের সীমা পরীক্ষা করে। নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে জন্ম নেওয়া এই মহাজাগতিক দানব সবকিছু গিলে খায়। এমনকি আলোও পালাতে পারে না।
বিজ্ঞানীরা শত বছর ধরে ব্লাক হোল নিয়ে গবেষণা করছেন। আইনস্টাইন, হকিং, পেনরোজের মতো মহান মনীষীরা এর রহস্য উন্মোচনে কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে প্রথম ছবি তোলা হয়। এটি প্রমাণ করে তত্ত্ব সত্য।
ব্লাক হোল শুধু ধ্বংসকারী নয়। এটি গ্যালাক্সি গঠনে ভূমিকা রাখে। নক্ষত্র তৈরি নিয়ন্ত্রণ করে। মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা করে। এর অধ্যয়ন আমাদের মহাবিশ্ব বুঝতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতে আরও অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে।
আমাদের পৃথিবীর জন্য ব্লাক হোল কোনো হুমকি নয়। সবচেয়ে কাছেরটিও হাজার আলোকবর্ষ দূরে। তাই নিরাপদে এর সৌন্দর্য এবং রহস্য উপভোগ করতে পারি। বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। একদিন হয়তো ব্লাক হোলের সব রহস্য জানা যাবে। তবে এখনও অনেক পথ বাকি।
লেখকের নোট: এই নিবন্ধে ব্লাক হোল সম্পর্কে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আশা করি আপনি ব্লাক হোলের রহস্যময় জগত সম্পর্কে ভালো ধারণা পেয়েছেন। মহাবিশ্বের এই অবিশ্বাস্য বস্তু আমাদের জ্ঞানের সীমা প্রসারিত করে চলেছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQs)
ব্লাক হোল কি সত্যিই আছে?
হ্যাঁ, ব্লাক হোল সত্যিই আছে। ২০১৯ সালে প্রথম ছবি তোলা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনেক প্রমাণ পেয়েছেন। এক্স-রে পর্যবেক্ষণ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এর অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
ব্লাক হোলে পড়লে কি মরে যাব?
হ্যাঁ, ব্লাক হোলে পড়লে বাঁচা অসম্ভব। স্প্যাগেটিফিকেশন হবে এবং শরীর চূর্ণ হয়ে যাবে। সিঙ্গুলারিটিতে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কোনো উদ্ধার পথ নেই।
পৃথিবী কি ব্লাক হোলে পড়তে পারে?
না, পৃথিবী ব্লাক হোলে পড়বে না। সবচেয়ে কাছের ব্লাক হোল হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এত দূরত্বে কোনো প্রভাব নেই। তাই পৃথিবী সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ব্লাক হোল কি বৃদ্ধি পায়?
হ্যাঁ, ব্লাক হোল বৃদ্ধি পায়। যখন গ্যাস বা নক্ষত্র গিলে খায়, তখন ভর বাড়ে। সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোল কোটি কোটি বছরে বড় হয়েছে। এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে কিছু।
ব্লাক হোল থেকে পালানো যায়?
না, ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে গেলে পালানো অসম্ভব। কোনো শক্তিই যথেষ্ট নয়। এমনকি আলোর গতিও কাজ করে না। তবে বাইরে থাকলে নিরাপদ।
ব্লাক হোল কি চিরকাল থাকবে?
না, স্টিফেন হকিং বলেছেন ব্লাক হোল ধীরে ধীরে বাষ্প হয়। হকিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে কণা নির্গত হয়। তবে এটি কোটি কোটি বছর সময় নেবে। ছোট ব্লাক হোল দ্রুত শেষ হয়।
সবচেয়ে বড় ব্লাক হোল কোনটি?
TON 618 হলো সবচেয়ে বড় জানা ব্লাক হোল। এর ভর প্রায় ছয় হাজার কোটি সূর্যের সমান। এটি একটি কোয়াসারের কেন্দ্রে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে দশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে।
ব্লাক হোল কি ওয়ার্মহোল?
না, ব্লাক হোল এবং ওয়ার্মহোল আলাদা। ওয়ার্মহোল তাত্ত্বিক একটি টানেল। এটি দুই জায়গা সংযুক্ত করতে পারে। কিন্তু এর অস্তিত্ব প্রমাণিত নয়। ব্লাক হোল বাস্তব এবং প্রমাণিত।
ব্লাক হোল দেখতে কেমন?
ব্লাক হোল দেখা যায় না সরাসরি। কিন্তু চারপাশের উজ্জ্বল গ্যাস দেখা যায়। ছবিতে কালো বৃত্ত দেখা যায় চারপাশে আলোর বলয়। এটিই ব্লাক হোলের ছায়া।
কোয়াসার কি ব্লাক হোল?
কোয়াসার হলো সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোলের চারপাশের উজ্জ্বল অঞ্চল। ব্লাক হোল যখন প্রচুর গ্যাস গিলে খায়, তখন শক্তি নির্গত হয়। এটি এত উজ্জ্বল যে কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখা যায়।
ব্লাক হোল কি সময় ভ্রমণের পথ?
তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হতে পারে। ব্লাক হোল সময় ধীর করে। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বাঁচা অসম্ভব। তাই বাস্তবে সময় ভ্রমণ সম্ভব নয়। এটি শুধু তত্ত্বে আছে।
কৃত্রিম ব্লাক হোল তৈরি করা যায়?
না, মানুষ এখন কৃত্রিম ব্লাক হোল তৈরি করতে পারে না। এজন্য অসীম শক্তি দরকার। LHC এ ক্ষুদ্র ব্লাক হোল তৈরি হতে পারে বলা হয়। কিন্তু এগুলো তাত্ক্ষণিক বাষ্প হয়ে যায়। কোনো বিপদ নেই।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍






