ব্রয়লার মুরগি পালন এখন অনেকের জীবিকার মাধ্যম। সঠিক খাবার দিলে মুরগি দ্রুত বাড়ে। খামারিরা নিজেরাই খাবার তৈরি করে খরচ কমাতে পারেন। আজকের লেখায় আমরা জানব কীভাবে সহজে খাবার বানানো যায়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আপনি ভালো ফল পাবেন। চলুন শুরু করা যাক।
ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির উপাদানসমূহ

ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরিতে বিভিন্ন উপাদান লাগে। ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির নিয়ম জানতে হলে প্রথমে আপনাকে জানতে হবে কোন কোন জিনিস দরকার। ভুট্টা হলো প্রধান উপাদান যা শক্তি দেয়। গমও ব্যবহার করা যায় শক্তির জন্য। সয়াবিন মিল প্রোটিনের উৎস হিসেবে কাজ করে। চালের কুঁড়া সস্তা এবং পুষ্টিকর একটি উপাদান। তিলের খৈল প্রোটিন এবং তেল সরবরাহ করে। ঝিনুকের গুঁড়া ক্যালসিয়ামের জন্য জরুরি। লবণ মিনারেল ব্যালেন্স রাখে শরীরে। ভিটামিন প্রিমিক্স মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এসব উপাদান সঠিক পরিমাণে মিশিয়ে খাবার বানাতে হয়। বাজার থেকে ভালো মানের উপাদান কিনতে হবে।
ব্রয়লার মুরগির খাবারের রেসিপি
খাবারের রেসিপি বয়স অনুযায়ী আলাদা হয়। ছোট বাচ্চার জন্য স্টার্টার ফিড বানাতে হয়। এতে প্রোটিন বেশি থাকে প্রায় ২২-২৩ শতাংশ। ভুট্টা ৫০ কেজি, সয়াবিন মিল ৩৫ কেজি নিন। চালের কুঁড়া ৮ কেজি এবং তিলের খৈল ৪ কেজি দিন। ঝিনুকের গুঁড়া ১ কেজি ও লবণ ৩০০ গ্রাম মেশান। ভিটামিন প্রিমিক্স ৫০০ গ্রাম যোগ করুন শেষে। সব উপাদান ভালো করে মিক্সার দিয়ে মেশাতে হবে। মেশানোর সময় পানি দেওয়া যাবে না একদম। তিন সপ্তাহ পর গ্রোয়ার ফিড দিতে হবে। তখন প্রোটিন কমিয়ে ২০-২১ শতাংশ রাখুন। এভাবে রেসিপি বদলাতে হয় বয়স বাড়ার সাথে।
ব্রয়লার মুরগির খাবার কত দিনে তৈরি হয়
খাবার তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না। একটি ছোট খামারের জন্য দুই ঘণ্টায় শেষ করা যায়। প্রথমে উপাদান সংগ্রহ করতে হবে বাজার থেকে। তারপর ওজন মেপে আলাদা করে রাখুন প্রতিটি। মিক্সার মেশিন চালু করে ধীরে ধীরে উপাদান দিন। ১৫-২০ মিনিট ভালো করে মিশিয়ে নিন। মেশানো শেষে বস্তায় ভরে সংরক্ষণ করুন। শুকনো এবং ঠান্ডা জায়গায় রাখতে হবে খাবার। আর্দ্রতা থাকলে খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বায়ুরোধী বস্তা ব্যবহার করা ভালো। একবারে ১৫ দিনের খাবার তৈরি করা উচিত। বেশি দিনের খাবার একসাথে বানালে পুষ্টি কমে যায়। নিয়মিত তাজা খাবার দিলে মুরগি সুস্থ থাকে।
খাবার তৈরির প্রধান ধাপগুলো:
- উপাদান সংগ্রহ ও পরিমাপ করুন সঠিকভাবে
- মিক্সার মেশিনে সব উপাদান একসাথে দিন
- ১৫-২০ মিনিট ভালো করে মিশিয়ে নিন
- শুকনো বস্তায় ভরে সংরক্ষণ করুন
- ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় রাখুন
- সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার করুন
ব্রয়লার মুরগির খাদ্য ফর্মুলা
বয়স অনুযায়ী খাদ্য ফর্মুলা ভিন্ন হয়। প্রথম তিন সপ্তাহে স্টার্টার ফিড দিতে হয়। এতে প্রোটিন ২২-২৩ শতাংশ রাখুন। মেথিওনিন এবং লাইসিন যোগ করা জরুরি। তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে গ্রোয়ার ফিড দিন। প্রোটিন কমিয়ে ২০-২১ শতাংশ করুন। পাঁচ সপ্তাহ পর ফিনিশার ফিড শুরু করুন। তখন প্রোটিন ১৮-১৯ শতাংশ হলেই চলবে। শক্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে শেষ পর্যায়ে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস ভারসাম্য রাখা জরুরি। ভিটামিন এ, ডি, ই প্রতিদিন দিতে হবে। মিনারেল মিক্স খাবারে মিশিয়ে দিন নিয়মিত। এই ফর্মুলা মেনে চললে ভালো ফলাফল পাবেন। বাজারে প্রিমিক্স কিনে সহজেই ব্যবহার করা যায়।
ব্রয়লার খাবারের উপকারিতা ও ফলাফল
সঠিক খাবার দিলে মুরগি দ্রুত বাড়ে। ৩৫-৪০ দিনে বিক্রয়যোগ্য ওজন হয়। খাবারের পুষ্টি ভারসাম্য রোগ প্রতিরোধ করে। মুরগির মাংসের গুণমান বাড়ে খুব। মৃত্যুর হার কমে যায় অনেক। খাবার রূপান্তর হার বা FCR ভালো হয়। ওজন সমানভাবে বাড়ে সব মুরগির। খামারি বেশি লাভ করতে পারেন। বাজারে চাহিদা থাকে সুস্থ মুরগির। ক্রেতারা ভালো মাংস পেয়ে খুশি হন। নিজেদের তৈরি খাবার দিলে খরচ কমে। মান নিয়ন্ত্রণ করা যায় সহজে। খামারের লাভ বাড়ানোর এটাই মূল উপায়। তাই ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির নিয়ম শিখুন ভালো করে।
ব্রয়লার মুরগির ওজন বৃদ্ধির চার্ট
মুরগির ওজন বৃদ্ধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। প্রথম সপ্তাহে বাচ্চার ওজন ১৪০-১৬০ গ্রাম হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে ৩৫০-৪০০ গ্রাম হওয়া উচিত। তৃতীয় সপ্তাহে ৬৫০-৭০০ গ্রামে পৌঁছায়। চতুর্থ সপ্তাহে ১০০০-১১০০ গ্রাম হয় ভালো খামারে। পঞ্চম সপ্তাহে ১৪০০-১৫০০ গ্রাম হওয়া স্বাভাবিক। ষষ্ঠ সপ্তাহে ১৮০০-২০০০ গ্রাম হতে পারে। প্রতিদিন ৫০-৬০ গ্রাম ওজন বাড়া ভালো লক্ষণ। যদি কম বাড়ে তাহলে খাবার পরীক্ষা করুন। রোগ হলে বা খাবার কম হলে ওজন কমে। নিয়মিত ওজন মাপলে সমস্যা বুঝতে সহজ হয়। সাপ্তাহিক চার্ট রাখলে তুলনা করা যায়।
খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত প্রধান উপাদান:
- ভুট্টা – শক্তির প্রধান উৎস এবং সহজপাচ্য
- সয়াবিন মিল – উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ উপাদান
- চালের কুঁড়া – ভিটামিন বি সমৃদ্ধ ও সাশ্রয়ী
- তিলের খৈল – প্রোটিন ও তেল সরবরাহ করে
- ঝিনুকের গুঁড়া – ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস
- ভিটামিন প্রিমিক্স – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
ব্রয়লার মুরগি পালন বই pdf
ব্রয়লার মুরগি পালন সম্পর্কে অনেক বই পাওয়া যায়। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিনামূল্যে গাইড দেয়। তাদের ওয়েবসাইট থেকে পিডিএফ ডাউনলোড করা যায়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রিসার্চ পেপার শেয়ার করে। খামারি সমিতি থেকে ট্রেনিং ম্যানুয়াল পাবেন। অনলাইনে অনেক ফ্রি রিসোর্স আছে পড়ার জন্য। এসব বই থেকে খাদ্য ফর্মুলা শিখতে পারবেন। রোগ ব্যবস্থাপনার তথ্যও পাবেন বিস্তারিত। খামার ডিজাইন ও বাজার সম্পর্কে জানা যায়। নতুন খামারিদের জন্য বই পড়া জরুরি। অভিজ্ঞতা বাড়াতে নিয়মিত পড়াশোনা করুন। লাইব্রেরিতেও ভালো বই পাওয়া যায় প্রাণিপালন বিষয়ে।
ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির দানাদার খাদ্য তৈরির নিয়ম
ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খাবার ভিন্ন হয়। ব্রয়লারের খাবারে প্রোটিন বেশি দিতে হয়। লেয়ারের খাবারে ক্যালসিয়াম বেশি থাকে। ডিম উৎপাদনের জন্য ক্যালসিয়াম জরুরি লেয়ারে। ব্রয়লারের খাবার উচ্চ শক্তি সমৃদ্ধ হয়। লেয়ারকে দীর্ঘ সময় খাওয়াতে হয় নিয়মিত। দানাদার খাবার তৈরিতে পেলেট মেশিন লাগে। প্রথমে গুঁড়া খাবার ভালো করে মিশান। তারপর পেলেট মেশিনে দিয়ে দানা বানান। গরম অবস্থায় দানা নরম থাকে একটু। ঠান্ডা হলে শক্ত হয়ে যায় দানা। দানাদার খাবার সংরক্ষণ সহজ হয়। মুরগি সহজে খেতে পারে দানা খাবার। অপচয় কম হয় দানাদার খাবারে।
ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন পদ্ধতি
ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন হ্যাচারিতে হয়। প্রথমে ভালো জাতের ডিম সংগ্রহ করতে হয়। ব্রিডার ফার্ম থেকে ফার্টাইল ডিম আসে। ডিম পরিষ্কার করে হ্যাচারিতে রাখা হয়। তাপমাত্রা ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখতে হয়। আর্দ্রতা ৫৫-৬০ শতাংশ বজায় রাখা জরুরি। ডিম ঘুরাতে হয় নিয়মিত প্রতিদিন। ২১ দিন পর বাচ্চা ফুটে বের হয়। সুস্থ বাচ্চা আলাদা করে রাখা হয়। তারপর ভ্যাকসিন দিয়ে খামারে পাঠানো হয়। খামারিরা সাধারণত হ্যাচারি থেকে বাচ্চা কেনেন। নিজেরা বাচ্চা উৎপাদন করা খুব কঠিন। বড় বিনিয়োগ ও দক্ষতা লাগে এই কাজে।
খাবার তৈরির সময় সাধারণ ভুল:
- উপাদান পরিমাপে ভুল করা
- মিক্সিং সময় কম দেওয়া
- পুরনো উপাদান ব্যবহার করা
- আর্দ্র জায়গায় সংরক্ষণ করা
- ভিটামিন প্রিমিক্স বাদ দেওয়া
- একসাথে অনেক দিনের খাবার বানানো
ব্রয়লার মুরগির খাবার খরচ হিসাব
খাবার খরচ খামারের সবচেয়ে বড় খরচ। মোট খরচের ৬৫-৭০ শতাংশ খাবারে যায়। একটি মুরগি ৩৫ দিনে ৩-৩.৫ কেজি খাবার খায়। খাবারের দাম প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা ধরলে। একটি মুরগির খাবার খরচ হয় ১৫০-২১০ টাকা। বাচ্চার দাম ৪৫-৫৫ টাকা ধরতে হবে। ঔষধ ও ভ্যাকসিনে খরচ ১৫-২০ টাকা। বিদ্যুৎ ও শ্রম খরচ ১০-১৫ টাকা। মোট খরচ হয় প্রায় ২২০-৩০০ টাকা। বিক্রয়মূল্য ৩৫০-৪০০ টাকা পাওয়া যায়। প্রতি মুরগিতে লাভ হয় ৫০-১০০ টাকা। হাজার মুরগি পালন করলে ভালো আয় হয়। নিজে খাবার বানালে খরচ ৫-১০ টাকা কমে।
ব্রয়লার ফিড তৈরির কাঁচামাল
ব্রয়লার ফিড তৈরিতে বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহার হয়। ভুট্টা প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। গম ব্যবহার করলে ভুট্টার বিকল্প হতে পারে। সয়াবিন মিল প্রোটিনের সবচেয়ে ভালো উৎস। মাছের গুঁড়া অ্যামিনো এসিড সরবরাহ করে। চালের কুঁড়া ভিটামিন বি সমৃদ্ধ উপাদান। তিলের খৈল স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় সহজে। সরিষার খৈলও ব্যবহার করা যায় প্রোটিনের জন্য। ঝিনুকের গুঁড়া ক্যালসিয়ামের একমাত্র ভালো উৎস। ডাই-ক্যালসিয়াম ফসফেট ফসফরাস দেয়। লবণ সোডিয়াম ও ক্লোরাইড সরবরাহ করে। ভিটামিন প্রিমিক্স সব ভিটামিন একসাথে দেয়। মিনারেল প্রিমিক্স জিংক, কপার ইত্যাদি দেয়। মেথিওনিন ও লাইসিন আলাদা কিনতে হয়। কোলিন ক্লোরাইড লিভার সুস্থ রাখে। এসব কাঁচামাল বাজার থেকে কিনতে পারবেন সহজে।
ব্রয়লার মুরগির জন্য সেরা খাবার
সেরা খাবার হলো যেটা পুষ্টি ভারসাম্য রাখে। প্রোটিন, শক্তি, ভিটামিন সবকিছু থাকতে হবে। বাণিজ্যিক ফিড কোম্পানির খাবার ভালো মানের। তবে নিজে বানানো খাবারও ভালো হতে পারে। ভুট্টা ও সয়াবিন ভিত্তিক খাবার সবচেয়ে ভালো। মাছের গুঁড়া যোগ করলে আরও ভালো হয়। ভিটামিন প্রিমিক্স অবশ্যই দিতে হবে। প্রোবায়োটিক দিলে হজম ভালো হয়। এনজাইম যোগ করলে খাবার হজম সহজ হয়। জৈব অ্যাসিড রোগ প্রতিরোধ করে। তাজা এবং পরিষ্কার খাবার দিতে হবে সবসময়। পানি সবসময় পরিষ্কার রাখুন পাত্রে। খাবারের মান ভালো হলে ফলাফলও ভালো আসে।
ব্রয়লার খাবার তৈরির প্রক্রিয়া
খাবার তৈরির প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে হয়। প্রথমে সব কাঁচামাল সংগ্রহ করুন বাজার থেকে। প্রতিটি উপাদান আলাদা করে ওজন করুন। ওজন সঠিক না হলে পুষ্টি ভারসাম্য নষ্ট হয়। ছোট উপাদান যেমন লবণ, প্রিমিক্স আলাদা রাখুন। বড় উপাদান যেমন ভুট্টা, সয়াবিন মিক্সারে দিন। মিক্সার চালু করে ধীরে ধীরে মেশান। প্রথমে ১০ মিনিট শুধু বড় উপাদান মেশান। তারপর ছোট উপাদান যোগ করুন ধীরে। আরও ১০ মিনিট ভালো করে মিশিয়ে নিন। মেশানো শেষে বস্তায় ভরুন সাবধানে। বস্তার মুখ ভালো করে বেঁধে রাখুন। সংরক্ষণের জায়গা শুকনো ও ঠান্ডা হতে হবে। রোদ ও বৃষ্টি থেকে দূরে রাখুন খাবার।
বয়স অনুযায়ী দৈনিক খাবারের পরিমাণ:
| বয়স (দিন) | দৈনিক খাবার (গ্রাম) | খাবারের ধরন | প্রোটিন (%) |
| ১-৭ | ১৫-২৫ | স্টার্টার | ২২-২৩ |
| ৮-১৪ | ৪০-৫৫ | স্টার্টার | ২২-২৩ |
| ১৫-২১ | ৭০-৮৫ | গ্রোয়ার | ২০-২১ |
| ২২-২৮ | ১০০-১১৫ | গ্রোয়ার | ২০-২১ |
| ২৯-৩৫ | ১৩০-১৪৫ | ফিনিশার | ১৮-১৯ |
ব্রয়লার খাবার তৈরির ব্যয়
খাবার তৈরির ব্যয় উপাদানের দামের উপর নির্ভর করে। ১০০ কেজি খাবার বানাতে খরচ হয় প্রায়। ভুট্টা ৫০ কেজি দাম ২০০০-২২০০ টাকা। সয়াবিন মিল ৩০ কেজি দাম ২১০০-২৪০০ টাকা। চালের কুঁড়া ১০ কেজি দাম ২০০-২৫০ টাকা। তিলের খৈল ৫ কেজি দাম ৩০০-৩৫০ টাকা। ঝিনুকের গুঁড়া ২ কেজি দাম ৪০-৬০ টাকা। লবণ ৩০০ গ্রাম দাম ১০-১৫ টাকা। ভিটামিন প্রিমিক্স ৫০০ গ্রাম দাম ২৫০-৩০০ টাকা। মিনারেল প্রিমিক্স দাম ১৫০-২০০ টাকা। মেথিওনিন ও লাইসিন দাম ১০০-১৫০ টাকা। মোট খরচ হয় প্রায় ৫১৫০-৫৯২৫ টাকা। প্রতি কেজি খরচ পড়ে ৫১-৫৯ টাকা। বাজারে খাবার কিনলে ৬৫-৭৫ টাকা লাগে। তাই নিজে বানালে ১০-১৫ টাকা সাশ্রয় হয়।
ব্রয়লার মুরগির খামারের লাভের হিসাব
খামারের লাভ নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার উপর। ১০০০ মুরগির খামারের হিসাব দেখি। বাচ্চা কিনতে খরচ ৫০,০০০ টাকা। খাবার খরচ হয় ১,৮০,০০০ টাকা। ঔষধ ও ভ্যাকসিন খরচ ১৫,০০০ টাকা। বিদ্যুৎ ও শ্রম খরচ ১০,০০০ টাকা। শেড ভাড়া বা খরচ ১০,০০০ টাকা। মোট খরচ হয় ২,৬৫,০০০ টাকা। ৯৫০টি মুরগি বেঁচে থাকলে ৫ শতাংশ মৃত্যু। প্রতিটি ২ কেজি ওজন হলে মোট ১৯০০ কেজি। কেজি ১৯০ টাকা দরে বিক্রয় করলে। মোট বিক্রয় হয় ৩,৬১,০০০ টাকা। খরচ বাদ দিলে লাভ হয় ৯৬,০০০ টাকা। প্রতি মুরগিতে লাভ প্রায় ১০০ টাকা। মৃত্যুর হার কমলে লাভ আরও বেশি হয়।
ব্রয়লার মুরগির খাবারের মিশ্রণ রেসিপি
খাবার মিশ্রণে নির্দিষ্ট অনুপাত মানতে হয়। স্টার্টার ফিডে ভুট্টা ৫০ শতাংশ দিন। সয়াবিন মিল ৩৫ শতাংশ হবে। চালের কুঁড়া ৮ শতাংশ রাখুন। তিলের খৈল ৪ শতাংশ যোগ করুন। ঝিনুকের গুঁড়া ১ শতাংশ দিতে হবে। মাছের গুঁড়া ১ শতাংশ দিলে ভালো। লবণ ০.৩ শতাংশ রাখুন মিশ্রণে। ভিটামিন প্রিমিক্স ০.৫ শতাংশ দিন। মিনারেল প্রিমিক্স ০.২ শতাংশ যোগ করুন। মেথিওনিন ০.১৫ শতাংশ দিতে হবে। লাইসিন ০.১ শতাংশ মেশাতে হবে। এই অনুপাত মেনে মিশ্রণ তৈরি করুন। গ্রোয়ার ও ফিনিশারে অনুপাত একটু বদলাবে। প্রোটিন কমিয়ে শক্তি বাড়াতে হবে তখন।
খাবারের পুষ্টি উপাদান তালিকা:
- প্রোটিন – মাংস ও পালক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে
- শক্তি – দৈনন্দিন কাজ ও বৃদ্ধিতে দরকার
- ক্যালসিয়াম – হাড় মজবুত করে ও শেল তৈরি করে
- ফসফরাস – হাড় ও শক্তি বিপাকে কাজ করে
- ভিটামিন এ – দৃষ্টিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ করে
- ভিটামিন ডি – ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে
ব্রয়লার মুরগির খাবারের সমস্যা ও সমাধান
খাবারে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। খাবার খেতে না চাইলে স্বাদ বাড়ান। পানি কম খেলে ইলেক্ট্রোলাইট দিন। ডায়রিয়া হলে খাবারে প্রোটিন কমান। পালক পড়লে মেথিওনিন বাড়ান খাবারে। পা দুর্বল হলে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি দিন। ওজন কম বাড়লে শক্তি বাড়ান খাবারে। খাবার নষ্ট হলে ফেলে দিতে হবে। ছত্রাক দেখলে সেই খাবার ব্যবহার করবেন না। খাবার ভেজা হলে দ্রুত শুকিয়ে নিন। পোকা হলে রোদে দিয়ে মারতে পারেন। সঠিক সংরক্ষণ করলে সমস্যা কম হয়। নিয়মিত খাবার পাত্র পরিষ্কার করুন। পুরনো খাবার ফেলে নতুন দিন প্রতিদিন।
ব্রয়লার ফিড তৈরির মেশিন
খাবার তৈরিতে বিভিন্ন মেশিন ব্যবহার হয়। মিক্সার মেশিন সব উপাদান মেশায়। ক্রাশার মেশিন ভুট্টা ভাঙে ছোট করে। গ্রাইন্ডার মেশিন সব গুঁড়া করে। পেলেট মেশিন দানা খাবার তৈরি করে। ওজন মাপার স্কেল দরকার সব খামারে। ছোট খামারে হাতে চালানো মিক্সার চলে। বড় খামারে অটোমেটিক মেশিন লাগে। বিদ্যুৎ চালিত মেশিন দ্রুত কাজ করে। দেশি মেশিন সস্তা কিন্তু কম টেকসই। বিদেশি মেশিন দামি কিন্তু অনেক দিন চলে। মেশিন কিনার আগে দাম তুলনা করুন। রক্ষণাবেক্ষণ সহজ মেশিন কিনুন। খুচরা যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যায় এমন মেশিন ভালো। মেশিন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়।
ব্রয়লার মুরগির পুষ্টির প্রয়োজন
ব্রয়লার মুরগির নির্দিষ্ট পুষ্টি দরকার হয়। প্রোটিন লাগে মাংস ও পালক তৈরিতে। শক্তি লাগে বৃদ্ধি ও তাপ উৎপাদনে। ভিটামিন এ লাগে চোখ ও রোগ প্রতিরোধে। ভিটামিন ডি লাগে হাড় শক্ত করতে। ভিটামিন ই লাগে প্রজনন ক্ষমতায়। ভিটামিন কে লাগে রক্ত জমাট বাঁধতে। ক্যালসিয়াম লাগে হাড় ও ডিমের খোসায়। ফসফরাস লাগে হাড় ও শক্তি বিপাকে। সোডিয়াম ও পটাসিয়াম লাগে পানি ভারসাম্যে। জিংক লাগে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায়। কপার লাগে রক্ত তৈরিতে। আয়োডিন লাগে থাইরয়েড হরমোনে। মেথিওনিন ও লাইসিন লাগে প্রোটিন তৈরিতে। সব পুষ্টি সঠিক পরিমাণে দিতে হবে।
স্টার্টার ফিডের উপাদান অনুপাত (১০০ কেজি):
| উপাদান | পরিমাণ (কেজি) | দাম (টাকা) | প্রোটিন (%) |
| ভুট্টা | ৫০ | ২১০০ | ৯ |
| সয়াবিন মিল | ৩৫ | ২৪৫০ | ৪৪ |
| চালের কুঁড়া | ৮ | ২০০ | ১৩ |
| তিলের খৈল | ৪ | ৩০০ | ৪০ |
| ঝিনুকের গুঁড়া | ১ | ৫০ | – |
| ভিটামিন প্রিমিক্স | ০.৫ | ৩০০ | – |
| লবণ | ০.৩ | ১৫ | – |
ব্রয়লার ফিড ক্যালকুলেশন চার্ট
ফিড ক্যালকুলেশন করা জরুরি খরচ জানতে। প্রতিটি মুরগি দৈনিক কত খায় তা হিসাব করুন। প্রথম সপ্তাহে দিনে ১৫-২৫ গ্রাম খায়। দ্বিতীয় সপ্তাহে দিনে ৪০-৫৫ গ্রাম। তৃতীয় সপ্তাহে দিনে ৭০-৮৫ গ্রাম। চতুর্থ সপ্তাহে দিনে ১০০-১১৫ গ্রাম। পঞ্চম সপ্তাহে দিনে ১৩০-১৪৫ গ্রাম খায়। মোট ৩৫ দিনে ৩-৩.৫ কেজি খাবার লাগে। ১০০০ মুরগির জন্য ৩০০০-৩৫০০ কেজি খাবার। প্রতি কেজি ৫৫ টাকা ধরলে খরচ ১,৮০,০০০ টাকা। FCR বা খাদ্য রূপান্তর হার ১.৬-১.৮ ভালো। এর মানে ১ কেজি ওজন বাড়াতে ১.৬-১.৮ কেজি খাবার লাগে। নিয়মিত হিসাব রাখলে লাভ ক্ষতি বুঝা যায়।
ব্রয়লার খাবার তৈরির ধাপ
খাবার তৈরির নির্দিষ্ট ধাপ আছে। প্রথম ধাপে কাঁচামাল সংগ্রহ করুন। দ্বিতীয় ধাপে সব উপাদান পরিষ্কার করুন। তৃতীয় ধাপে প্রতিটি উপাদান ওজন করুন। চতুর্থ ধাপে মিক্সারে বড় উপাদান দিন। পঞ্চম ধাপে ১০ মিনিট মিশিয়ে নিন। ষষ্ঠ ধাপে ছোট উপাদান যোগ করুন। সপ্তম ধাপে আরও ১০ মিনিট মেশান। অষ্টম ধাপে বস্তায় ভরে রাখুন। নবম ধাপে বস্তার মুখ বেঁধে দিন। দশম ধাপে শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করুন। প্রতিটি ধাপ সাবধানে করতে হবে। কোনো ধাপ বাদ দিলে খাবারের মান খারাপ হয়। ধাপ অনুসরণ করলে ভালো খাবার তৈরি হয়।
খাবার সংরক্ষণের নিয়ম:
- শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায় রাখুন
- সরাসরি মাটিতে বস্তা রাখবেন না
- বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করুন
- রোদ ও বৃষ্টি থেকে দূরে রাখুন
- ইঁদুর থেকে সুরক্ষিত রাখুন
- ১৫ দিনের বেশি রাখবেন না
ব্রয়লার মুরগির খাদ্য ব্যবস্থাপনা
খাদ্য ব্যবস্থাপনা খামারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিন। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা তিন বেলা খাওয়ান। খাবার পাত্র সবসময় পরিষ্কার রাখুন। পুরনো খাবার ফেলে নতুন দিন। প্রতিটি মুরগি খাবার পায় তা নিশ্চিত করুন। পানি সবসময় পর্যাপ্ত রাখতে হবে। খাবার পরিমাণ বয়স অনুযায়ী বাড়ান। বেশি খাবার দিলে অপচয় হয়। কম খাবার দিলে ওজন কম বাড়ে। রাতে খাবার পাত্র খালি না রাখাই ভালো। খাবার স্টক নিয়মিত চেক করুন। ফাঁকা পাত্রে মুরগি খুঁটে ক্ষতি হতে পারে। সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে মুরগি সুস্থ থাকে।
ব্রয়লার মুরগির খাদ্য সিডিউল
বয়স অনুযায়ী খাদ্য সিডিউল আলাদা হয়। ১-৭ দিন বয়সে স্টার্টার ফিড দিন। দিনে ৪-৫ বার খাওয়ান অল্প করে। ৮-২১ দিন বয়সেও স্টার্টার চালিয়ে যান। দিনে ৩-৪ বার খাওয়ানো যথেষ্ট। ২২-৩৫ দিন বয়সে গ্রোয়ার ফিড দিন। দিনে ২-৩ বার খাওয়ালেই হবে। প্রতিদিন সকাল ৮টায় প্রথম খাবার দিন। দুপুর ১২টায় দ্বিতীয় খাবার দিন। সন্ধ্যা ৬টায় শেষ খাবার দিতে পারেন। রাতে খাবার পাত্র পূর্ণ রাখুন সব সময়। খাবার দেওয়ার সময় একই রাখলে ভালো। মুরগি অভ্যস্ত হয়ে যায় নির্দিষ্ট সময়ে। সিডিউল মেনে চললে ফলাফল ভালো আসে।
ব্রয়লার মুরগির খাদ্য দেওয়া নিয়ম
খাদ্য দেওয়ার নিয়ম মানা জরুরি। খাবার দেওয়ার আগে পাত্র পরিষ্কার করুন। পুরনো খাবার ফেলে দিয়ে নতুন দিন। খাবার পাত্র সবার নাগালে রাখুন। ছোট মুরগি যেন পায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। খাবার পাত্র মাটি থেকে একটু উঁচুতে রাখুন। মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী পাত্র রাখুন। ১০০ মুরগিতে ৪-৫টি খাবার পাত্র লাগে। পাত্র ছায়ায় রাখলে খাবার ভালো থাকে। রোদে বা বৃষ্টিতে পাত্র রাখবেন না। খাবার দেওয়ার সময় মুরগি দেখুন ভালো করে। অসুস্থ মুরগি আলাদা করে ফেলুন দ্রুত। খাবারে ঔষধ মেশালে ভালো করে মিশান। সব মুরগি সমানভাবে খাচ্ছে তা নিশ্চিত করুন।
গ্রোয়ার ফিডের উপাদান অনুপাত (১০০ কেজি):
| উপাদান | পরিমাণ (কেজি) | প্রোটিন অবদান (%) | খরচ (টাকা) |
| ভুট্টা | ৫৫ | ৮.৫ | ২৩১০ |
| সয়াবিন মিল | ৩০ | ৪২ | ২১০০ |
| চালের কুঁড়া | ১০ | ১২ | ২৫০ |
| তিলের খৈল | ৩ | ৩৮ | ২২৫ |
| মাছের গুঁড়া | ০.৫ | ৬৫ | ১৫০ |
| অন্যান্য | ১.৫ | – | ৩০০ |
ব্রয়লার খাবারে ভিটামিন ও মিনারেল
ভিটামিন ও মিনারেল খুব জরুরি উপাদান। ভিটামিন এ চোখ ও ত্বক সুস্থ রাখে। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে। ভিটামিন ই প্রজনন ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্স শক্তি তৈরি করে। ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে ও খোসা তৈরি করে। ফসফরাস হাড় ও শক্তি বিপাকে কাজ করে। জিংক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আয়রন রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। সেলেনিয়াম অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ম্যাঙ্গানিজ হাড় গঠনে লাগে। এসব ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্সে পাওয়া যায়। প্রিমিক্স নিয়মিত খাবারে মেশাতে হবে।
ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির ব্যবসা পরিকল্পনা
খাবার তৈরির ব্যবসা লাভজনক হতে পারে। প্রথমে বাজার গবেষণা করতে হবে ভালো করে। আশেপাশের খামারিদের চাহিদা জানুন। কত খামারি নিজে খাবার বানান তা দেখুন। তারপর মূলধন হিসাব করে বিনিয়োগ করুন। মেশিন কেনা ও জায়গা ভাড়া খরচ ধরুন। কাঁচামাল সরবরাহকারী খুঁজে নিন নির্ভরযোগ্য। খাবারের মান পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখুন। শ্রমিক নিয়োগ দিন অভিজ্ঞ লোক। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নিশ্চিত করুন। লাইসেন্স ও অনুমতি নিন সরকার থেকে। দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখুন বাজারে। মান ভালো রাখলে ক্রেতা বাড়বে ধীরে ধীরে। ডেলিভারি সময়মতো দিতে হবে সব সময়। এভাবে ব্যবসা পরিকল্পনা করলে সফল হওয়া যায়।
খাবার তৈরির সাধারণ ভুল এড়ানোর উপায়:
- উপাদান পরিমাপ সবসময় সঠিক করুন
- পুরনো বা নষ্ট উপাদান ব্যবহার করবেন না
- মিক্সিং সময় কমাবেন না কখনো
- ভিটামিন প্রিমিক্স বাদ দেবেন না
- সংরক্ষণ স্থান শুকনো রাখুন সবসময়
- বেশি দিনের খাবার একসাথে বানাবেন না
ব্রয়লার খাবারের খরচ কমানোর উপায়
খাবারের খরচ কমানো সম্ভব কয়েকভাবে। স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করলে খরচ কমে। সরাসরি মিলের কাছ থেকে উপাদান কিনুন। অন্য খামারির সাথে মিলে কিনলে দাম কম পাবেন। নিজে খাবার বানালে শ্রম খরচ বাঁচে। অপচয় কমানোর দিকে নজর দিন সবসময়। খাবার সংরক্ষণ ভালো করলে নষ্ট কম হয়। সঠিক পরিমাণ খাবার দিলে অপচয় এড়ানো যায়। খাবার পাত্র ডিজাইন ভালো হলে কম পড়ে। মুরগি সুস্থ থাকলে খাবার কম লাগে। রোগ প্রতিরোধ করলে ঔষধ খরচ কমে। FCR ভালো রাখার চেষ্টা করুন সবসময়। বিকল্প উপাদান ব্যবহার করা যায় দাম দেখে। তবে মান নিয়ে আপস করা যাবে না। খরচ কমাতে গিয়ে মান নষ্ট করবেন না।
লোকাল উপাদান দিয়ে ব্রয়লার খাবার তৈরি
লোকাল উপাদান ব্যবহার করে খরচ কমানো যায়। ভুট্টার বদলে গম ব্যবহার করা যায়। চালের কুঁড়া সহজে পাওয়া যায় স্থানীয়ভাবে। কলার খোসা শুকিয়ে গুঁড়া করে দেওয়া যায়। মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে খাওয়ানো যায়। শাকসবজির উচ্ছিষ্ট কেটে দিতে পারেন। ছোট মাছ শুকিয়ে গুঁড়া করে মেশান। শামুক ঝিনুক শুকিয়ে ক্যালসিয়ামের উৎস হতে পারে। পেঁপের বিচি ও পাতা ব্যবহার করা যায়। তিলের খৈল স্থানীয় তেলকলে পাওয়া যায়। এসব উপাদান পুষ্টিকর এবং সহজলভ্য। তবে অতিরিক্ত দিলে হজমের সমস্যা হতে পারে। ধীরে ধীরে মেশাতে হবে খাবারে। পরিমাণ ১০-১৫ শতাংশের বেশি না দেওয়াই ভালো।
ব্রয়লার ফিড প্রিমিক্সের ব্যবহার
প্রিমিক্স ব্রয়লার খাবারের জরুরি উপাদান। এতে সব ভিটামিন ও মিনারেল থাকে একসাথে। বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের প্রিমিক্স পাওয়া যায়। ১০০ কেজি খাবারে ৫০০ গ্রাম প্রিমিক্স দিতে হয়। প্রিমিক্স সবশেষে মেশাতে হবে খাবারে। বেশি গরমে প্রিমিক্স নষ্ট হতে পারে। ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করুন। মেয়াদ শেষ প্রিমিক্স ব্যবহার করবেন না। ভালো কোম্পানির প্রিমিক্স কিনুন সবসময়। দাম কম দেখে নিম্নমানের কিনবেন না। প্রিমিক্স দিলে মুরগি সুস্থ থাকে ও দ্রুত বাড়ে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে অনেক। পালক সুন্দর ও চকচকে হয়। প্রিমিক্স ছাড়া খাবার অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ফিনিশার ফিডের উপাদান অনুপাত:
| উপাদান | পরিমাণ (%) | কাজ | উপকারিতা |
| ভুট্টা | ৬০ | শক্তি | দ্রুত ওজন বাড়ায় |
| সয়াবিন মিল | ২৫ | প্রোটিন | মাংস তৈরি করে |
| চালের কুঁড়া | ১০ | ভিটামিন বি | হজম সহায়ক |
| তিলের খৈল | ২ | প্রোটিন ও তেল | ত্বক উন্নত করে |
| অন্যান্য | ৩ | ভিটামিন মিনারেল | সার্বিক স্বাস্থ্য |
ব্রয়লার মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির টিপস

মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির কিছু টিপস আছে। উচ্চ প্রোটিন খাবার প্রথম তিন সপ্তাহ দিন। পরিষ্কার পানি সবসময় রাখুন পর্যাপ্ত। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন ঠিকমতো। প্রথম সপ্তাহে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখুন। প্রতি সপ্তাহে ৩ ডিগ্রি করে কমান। আলো ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করুন। প্রথম সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা আলো দিন। পরে ধীরে ধীরে কমিয়ে ১৮ ঘণ্টা করুন। ভিটামিন সি গরমে বেশি দিন। প্রোবায়োটিক নিয়মিত খাবারে মেশান। ভ্যাকসিন সময়মতো দিন সব সময়। শেড পরিষ্কার রাখুন নিয়মিত। ভিড় কম রাখুন শেডে। প্রতি বর্গফুটে ১ কেজি ওজনের মুরগি রাখুন। স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুন সবসময়। এসব টিপস মানলে মুরগি দ্রুত বাড়বে।
উপসংহার
ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরি কঠিন কাজ নয়। সঠিক জ্ঞান ও পরিকল্পনা থাকলে সফল হওয়া যায়। নিজে খাবার বানালে খরচ কমে অনেক। খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ করা যায় সহজে। উপাদান সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত সব ধাপ জানা জরুরি। বয়স অনুযায়ী খাবার পরিবর্তন করতে হয়। প্রোটিন, শক্তি ও ভিটামিনের ভারসাম্য রাখা দরকার। প্রিমিক্স ও মিনারেল বাদ দেওয়া যাবে না। সঠিক মিক্সিং ও সংরক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত খাবারের মান পরীক্ষা করুন। মুরগির ওজন বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করুন সব সময়। খরচ হিসাব রেখে লাভ ক্ষতি বুঝুন। ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির নিয়ম অনুসরণ করলে আপনি সফল খামারি হতে পারবেন। আশা করি এই লেখা আপনার কাজে লাগবে। খামারে সফলতা কামনা করছি সবার জন্য।
লেখকের নোট: এই নিবন্ধে আমরা ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরির সব দিক আলোচনা করেছি। আপনি যদি এই নিয়ম মেনে চলেন তাহলে অবশ্যই সফল হবেন। আপনার খামারে শুভকামনা রইল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQs)
ব্রয়লার মুরগির খাবার তৈরিতে কোন উপাদানগুলো অবশ্যই লাগে?
ভুট্টা, সয়াবিন মিল, চালের কুঁড়া, ঝিনুকের গুঁড়া, লবণ ও ভিটামিন প্রিমিক্স অবশ্যই লাগে। এসব উপাদান ছাড়া সম্পূর্ণ খাবার তৈরি সম্ভব নয়।
খাবার তৈরিতে কত টাকা খরচ হয়?
১০০ কেজি খাবার তৈরিতে ৫১৫০-৫৯২৫ টাকা খরচ হয়। বাজার থেকে কিনলে খরচ পড়ে ৬৫০০-৭৫০০ টাকা। তাই নিজে বানালে ১০-১৫ টাকা প্রতি কেজি সাশ্রয় হয়।
ব্রয়লার মুরগি ৩৫ দিনে কত কেজি খাবার খায়?
একটি ব্রয়লার মুরগি ৩৫ দিনে ৩-৩.৫ কেজি খাবার খায়। এই পরিমাণ নির্ভর করে মুরগির জাত ও খাবারের মানের উপর।
খাবার কত দিন সংরক্ষণ করা যায়?
তৈরি খাবার সর্বোচ্চ ১৫ দিন সংরক্ষণ করা উচিত। বেশি দিন রাখলে পুষ্টি মান কমে যায় এবং খাবার নষ্ট হতে পারে।
স্টার্টার ও গ্রোয়ার ফিডের পার্থক্য কী?
স্টার্টার ফিডে প্রোটিন ২২-২৩ শতাংশ থাকে। গ্রোয়ার ফিডে প্রোটিন ২০-২১ শতাংশ রাখা হয়। স্টার্টার দিয়ে প্রথম ২১ দিন এবং তারপর গ্রোয়ার দিতে হয়।
ভিটামিন প্রিমিক্স কেন জরুরি?
প্রিমিক্সে সব ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। এটা মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। প্রিমিক্স ছাড়া মুরগি দুর্বল হয় এবং রোগে আক্রান্ত হয় সহজে।
FCR কী এবং কত হওয়া ভালো?
FCR মানে খাদ্য রূপান্তর হার বা Feed Conversion Ratio। এটি ১.৬-১.৮ হলে ভালো। এর মানে ১ কেজি ওজন বাড়াতে ১.৬-১.৮ কেজি খাবার লাগে।
দানাদার খাবার তৈরি করা কি জরুরি?
দানাদার খাবার জরুরি না তবে ভালো। দানা খাবার সংরক্ষণ সহজ এবং অপচয় কম হয়। তবে গুঁড়া খাবারও ভালো কাজ করে।
খাবারে মাছের গুঁড়া কেন দেওয়া হয়?
মাছের গুঁড়ায় উচ্চ মানের প্রোটিন থাকে। এতে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড পাওয়া যায়। তবে দাম বেশি হওয়ায় সবাই দেয় না।
লোকাল উপাদান কতটা ব্যবহার করা যায়?
লোকাল উপাদান ১০-১৫ শতাংশ ব্যবহার করা যায়। বেশি দিলে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে পরিমাণ।
খাবার তৈরিতে কোন মেশিন সবচেয়ে জরুরি?
মিক্সার মেশিন সবচেয়ে জরুরি খাবার তৈরিতে। এটা ছাড়া সব উপাদান ভালো করে মেশানো যায় না। ছোট খামারে হাতে চালানো মিক্সারও চলে।
ব্রয়লার খাবারে ক্যালসিয়াম কত শতাংশ থাকা উচিত?
ব্রয়লার খাবারে ক্যালসিয়াম ০.৯-১.০ শতাংশ রাখা উচিত। বেশি হলে কিডনিতে সমস্যা হয় এবং কম হলে হাড় দুর্বল হয়।
গরমে খাবার কি বেশি দিতে হয়?
গরমে মুরগি কম খায় কিন্তু পানি বেশি খায়। খাবারে শক্তি বাড়ান এবং ভিটামিন সি দিন বেশি করে।
খাবারে পোকা হলে কী করব?
খাবার রোদে দিয়ে শুকিয়ে নিন ভালো করে। পোকা মরে গেলে আবার ব্যবহার করতে পারেন। তবে বেশি নষ্ট হলে ফেলে দিন।
ব্রয়লার মুরগির খাবার কি লেয়ার মুরগিকে দেওয়া যায়?
না, দেওয়া উচিত নয়। ব্রয়লার খাবারে প্রোটিন বেশি এবং ক্যালসিয়াম কম। লেয়ারের জন্য আলাদা খাবার তৈরি করতে হয়।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍






