সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। এই সমস্যা এখন গোটা বিশ্বের জন্য বড় চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে উপকূলীয় দেশগুলো এই বিপদের মুখে পড়ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকূলে বাস করে। তাদের জীবন এখন হুমকির মুখে। আজকের এই লেখায় আমরা জানব সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য।

👉 এক নজরে প্রবন্ধটির মূল বিষয়বস্তু/সূচিপত্রঃ 📖

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কাকে বলে

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কাকে বলে ও এর সহজ সংজ্ঞা

সমুদ্রের পানির স্তর যখন ধীরে ধীরে বাড়ে তাকে বলা হয় সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও এখন দ্রুত হারে ঘটছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় লক্ষণ বলে মনে করেন। গত ১০০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা প্রায় ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এই বৃদ্ধি আগামী দিনে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সহজ কথায়, সমুদ্রের পানি যখন স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসে তখনই এই সমস্যা দেখা দেয়। এটি মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ

সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় কারণ। তাপমাত্রা বাড়লে পানি প্রসারিত হয়। এতে সমুদ্রের আয়তন বাড়ে। দ্বিতীয়ত, মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফের স্তর গলে পানিতে মিশছে। এই পানি সরাসরি সমুদ্রে যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয়ত, পাহাড়ি এলাকার হিমবাহ গলছে দ্রুত হারে। হিমালয়, আল্পস এবং অন্যান্য পর্বতের বরফ কমছে। এসব বরফগলা পানি নদী হয়ে সমুদ্রে পড়ছে। চতুর্থত, মানুষের কর্মকাণ্ড এই সমস্যা বাড়াচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে প্রতিদিন।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কেন হয়

এই সমস্যার মূল কারণ হলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং। কারখানা থেকে বের হওয়া ধোঁয়া বাতাসে মিশছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া পরিবেশ নষ্ট করছে। এসব কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে জমা হচ্ছে। এতে পৃথিবীর চারদিকে একটি আবরণ তৈরি হয়েছে। সূর্যের তাপ এই আবরণ ভেদ করে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু ফেরত যেতে পারে না। ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গ্রিনহাউস প্রভাব। বনভূমি কাটা হচ্ছে অবাধে। গাছপালা কার্বন শোষণ করে। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ায় কার্বন বাতাসে থেকে যাচ্ছে। সমুদ্রও তাপ শোষণ করে অনেক। কিন্তু সে ক্ষমতারও সীমা আছে।

মূল কারণগুলো সংক্ষেপে:

  • গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ: কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে
  • বন উজাড়: গাছপালা কমে যাওয়ায় কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমছে
  • শিল্পায়ন: কলকারখানা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস বের হচ্ছে
  • যানবাহনের ধোঁয়া: লাখো গাড়ি প্রতিদিন বায়ু দূষণ করছে
  • জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার: কয়লা ও তেল পোড়ানো হচ্ছে বেশি মাত্রায়

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব

এই বৃদ্ধির প্রভাব অনেক ব্যাপক। প্রথমে, উপকূলীয় এলাকা ডুবে যাচ্ছে। অনেক দ্বীপ সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, লবণাক্ত পানি ঢুকছে মাটিতে। এতে চাষাবাদ হচ্ছে না। কৃষকরা ফসল ফলাতে পারছে না। তৃতীয়ত, পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে। লবণ পানি মিঠা পানির উৎস নষ্ট করছে। চতুর্থত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। পঞ্চমত, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। ষষ্ঠত, পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্র সৈকত ডুবে যাওয়ায় পর্যটকরা আসছে না।

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

গ্লোবাল ওয়ার্মিং হলো সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মূল চালক। তাপমাত্রা বাড়লে সমুদ্রের পানি প্রসারিত হয়। এটাকে বলা হয় তাপীয় প্রসারণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ৫০ বছরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পানির আয়তন বাড়ে। এতে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপীয় প্রসারণ সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধির ৩০ শতাংশ কারণ। বাকি ৭০ শতাংশ আসে বরফ গলন থেকে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এই দুটি প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করছে। প্রতি বছর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তন আর সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পরস্পর সম্পর্কিত। জলবায়ু বদলাচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে। বৃষ্টির ধরন পাল্টে যাচ্ছে। কোথাও খরা, কোথাও বন্যা। ঋতুর হিসাব আর মিলছে না। শীত কমছে, গরম বাড়ছে। এসব পরিবর্তন সমুদ্রকে প্রভাবিত করছে। সমুদ্রের স্রোত পাল্টে যাচ্ছে। পানির তাপমাত্রা বদলাচ্ছে। এতে সামুদ্রিক জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। প্রবাল প্রাচীর মরে যাচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যাপক।

জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণসমূহ:

  • তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গত দশকগুলোতে রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা বেড়েছে
  • বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন: কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও অনাবৃষ্টি দেখা যাচ্ছে
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং খরা বাড়ছে
  • ঋতু পরিবর্তন: ঋতুর স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
  • বরফ গলন: মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে

বরফ গলন ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে বিশাল পরিমাণ বরফ জমা আছে। এই বরফ গলছে অস্বাভাবিক হারে। গ্রিনল্যান্ডে প্রতি বছর প্রায় ২৮০ বিলিয়ন টন বরফ গলছে। অ্যান্টার্কটিকায় এই হার আরও বেশি। বরফ গললে সরাসরি সমুদ্রে পানি যোগ হয়। আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্র বরফও কমছে। তবে এটা সমুদ্রের উপরে ভাসমান। তাই এর গলন সরাসরি উচ্চতা বাড়ায় না। কিন্তু এটা সূর্যের তাপ শোষণ বাড়ায়। বরফ সাদা হওয়ায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। বরফ কমলে গাঢ় পানি বেশি তাপ শোষণ করে। এতে সমুদ্রের তাপমাত্রা আরও বাড়ে।

অঞ্চলবার্ষিক বরফ গলনের হারঅবদান (মিলিমিটার/বছর)
গ্রিনল্যান্ড২৮০ বিলিয়ন টন০.৮
অ্যান্টার্কটিকা১৫০ বিলিয়ন টন০.৪
হিমবাহসমূহ২২০ বিলিয়ন টন০.৬
মোট অবদান১.৮

মেরু অঞ্চলের বরফ গলন কেন বিপজ্জনক

মেরু অঞ্চলের বরফ গলা শুধু সমুদ্র উচ্চতা বাড়ায় না। এটা পুরো পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা বদলে দেয়। মেরু অঞ্চল পৃথিবীর রেফ্রিজারেটরের মতো কাজ করে। বরফ ঠান্ডা রাখে পরিবেশকে। বরফ কমলে ঠান্ডা কমে। এতে আবহাওয়ার ধরন পাল্টে যায়। সমুদ্রের স্রোত নির্ভর করে তাপমাত্রার তারতম্যের উপর। মেরু ঠান্ডা, বিষুব অঞ্চল গরম। এই পার্থক্য স্রোত তৈরি করে। মেরু গরম হলে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। গালফ স্ট্রিম নামের একটি বড় স্রোত ইউরোপ উষ্ণ রাখে। বরফ গললে এই স্রোত দুর্বল হতে পারে।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলাফল

এই সমস্যার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রথমত, ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। মালদ্বীপ, তুভালু এমন দেশগুলো হুমকিতে আছে। দ্বিতীয়ত, উপকূলীয় শহরগুলো ঝুঁকিতে পড়ছে। মিয়ামি, মুম্বাই, ঢাকা এমন শহরে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তৃতীয়ত, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। চতুর্থত, অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বিপুল। সম্পত্তি নষ্ট, ফসল নষ্ট, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পঞ্চমত, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

সংক্ষিপ্ত ফলাফল:

  • ভূমি ক্ষয়: উপকূলীয় এলাকা ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছে
  • মাটির লবণাক্ততা: কৃষি জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে
  • পানীয় জল সংকট: মিঠা পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে
  • অবকাঠামো ক্ষতি: রাস্তা, ব্রিজ, বাড়িঘর ভাঙছে
  • মানবিক সংকট: লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে যাচ্ছে

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কোন কোন দেশে প্রভাব ফেলে

এই সমস্যা সব দেশে সমান নয়। উপকূলীয় এবং নিচু দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। দেশের দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্র থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচু। ভারতের উপকূলীয় শহরগুলোও বিপদে আছে। মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই এসব শহর ঝুঁকিতে। মালদ্বীপের গড় উচ্চতা মাত্র ১.৫ মিটার। এই দেশ পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা ডুবে যাচ্ছে দ্রুত। তাই তারা নতুন রাজধানী বানাচ্ছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনও ক্ষতিগ্রস্ত। ইউরোপে নেদারল্যান্ডস বড় ঝুঁকিতে।

দেশঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা (মিলিয়ন)উপকূলীয় এলাকা (%)
বাংলাদেশ৩০২০
ভারত৪০১৫
চীন৭০১০
ইন্দোনেশিয়া২৫৩০

বাংলাদেশের সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

বাংলাদেশের জন্য এই সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবন এলাকায় লবণ পানি ঢুকছে। এতে ম্যানগ্রোভ বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঘূর্ণিঝড় বেশি আঘাত হানছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। কৃষি জমিতে লবণ ঢুকায় ফসল হচ্ছে না। পানীয় জলের সংকট তীব্র হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে। এতে প্রায় ৩ করোড় মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এই মানুষগুলো শহরে চলে যাচ্ছে। এতে শহরে চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ১৯টি জেলা আছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী অন্যতম। এসব জেলায় প্রায় ৪ করোড় মানুষ বাস করে। এদের বেশিরভাগ কৃষি ও মৎস্যজীবী। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ায় তাদের জীবিকা হুমকিতে পড়ছে। ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ এসব দ্বীপ ডুবে যাচ্ছে। কুয়াকাটা, কক্সবাজার সৈকত ছোট হয়ে আসছে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জেলায় লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে। চিংড়ি চাষ বাড়ছে কিন্তু তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান জেলাসমূহ:

  • খুলনা: সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত
  • বরিশাল: নদী ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হেক্টর জমি হারাচ্ছে
  • পটুয়াখালী: ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে
  • কক্সবাজার: সমুদ্র সৈকত ছোট হয়ে আসছে
  • ভোলা: দ্বীপের আয়তন ক্রমাগত কমছে

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা

বাংলাদেশের নিচু এলাকাগুলো সবচেয়ে বিপদে আছে। হাওর এলাকায় বন্যা বাড়ছে। চরাঞ্চলে মানুষ নিরাপদ নয়। সুন্দরবনের গোলপাতা বন মরে যাচ্ছে। এতে বাঘ ও হরিণের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। মহেশখালী, কুতুবদিয়া দ্বীপ ছোট হচ্ছে। এসব এলাকার মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকিতে থাকছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডর, আম্পান অনেক ক্ষতি করেছে। এসব ঝড়ের প্রভাব আগের চেয়ে বেশি। কারণ সমুদ্র আগের চেয়ে উঁচু। তাই জলোচ্ছ্বাস বেশি ভিতরে ঢোকে। বাঁধ ভেঙে গ্রাম ডুবে যায়।

সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের গড় উচ্চতা

বাংলাদেশ একটি সমতল দেশ। সমুদ্র থেকে গড় উচ্চতা মাত্র ৮৫ মিটার। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় এটা আরও কম। অনেক জায়গায় মাত্র ১-২ মিটার উচ্চতা। এটাই বড় সমস্যা। সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লেই বিপুল এলাকা ডুবে যাবে। দেশের মাঝামাঝি অঞ্চল একটু উঁচু। কিন্তু সেখানেও বন্যার ঝুঁকি আছে। নদীভাঙন আরেকটি বড় সমস্যা। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা নদী প্রতি বছর হাজার হেক্টর জমি গ্রাস করছে। উপকূলে জোয়ারের পানি আগের চেয়ে বেশি ওঠে। এতে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নামছে। মানুষ গভীর নলকূপ বসাচ্ছে। কিন্তু সেই পানিতেও লবণ মিশছে ধীরে ধীরে।

সাগরপৃষ্ঠ থেকে ঢাকার উচ্চতা কত

ঢাকা শহর সমুদ্র থেকে প্রায় ৪ মিটার উঁচু। তবে বিভিন্ন এলাকায় উচ্চতা ভিন্ন। পুরান ঢাকা একটু নিচু। নতুন এলাকা তুলনামূলক উঁচু। তবুও ঢাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্মক। একটু বৃষ্টিতেই পানি জমে। এর কারণ নিষ্কাশন ব্যবস্থা খারাপ এবং খাল ভরাট। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে নদীর পানি সহজে সাগরে যেতে পারবে না। এতে বুড়িগঙ্গা নদীতে পানি জমবে। ফলে ঢাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়বে। যদিও ঢাকা সরাসরি উপকূলে নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়বে। উপকূল থেকে মানুষ ঢাকায় আসছে। এতে শহরের চাপ বাড়ছে।

শহর/এলাকাসমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা (মিটার)বন্যার ঝুঁকি
ঢাকা৪-৮মাঝারি
চট্টগ্রাম৩-৬উচ্চ
খুলনা২-৪অতি উচ্চ
বরিশাল১-৩অতি উচ্চ

বাংলাদেশের ভূমির উচ্চতা ও সাগরপৃষ্ঠের সম্পর্ক

বাংলাদেশের ভূমি গঠন অনন্য। তিনটি বড় নদী দেশের মধ্য দিয়ে গেছে। এসব নদী পলি বয়ে আনে। এই পলি জমে ভূমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ভূমি খুবই নিচু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সামান্য উঁচু মাত্র। তাই সমুদ্রের উচ্চতা বাড়া মানেই বিপদ। পাহাড়ি এলাকা শুধু পূর্ব ও উত্তরে। চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা উঁচু। সিলেট অঞ্চলেও পাহাড় আছে। কিন্তু এসব এলাকায় জনবসতি কম। বেশিরভাগ মানুষ নিচু সমতলে থাকে। এখানেই বিপদ বেশি। দেশের দক্ষিণে বদ্বীপ এলাকা সবচেয়ে নাজুক।

পৃথিবীর গড় উচ্চতা কত

পৃথিবীর স্থলভাগের গড় উচ্চতা প্রায় ৮৪০ মিটার। কিন্তু এটা খুব অসম। হিমালয় পর্বত ৮ হাজার মিটার উঁচু। আবার মৃত সাগর সমুদ্র থেকে ৪০০ মিটার নিচু। বাংলাদেশের উচ্চতা গড়ের চেয়ে অনেক কম। এশিয়ার পাহাড়ি দেশগুলো উঁচু। নেপাল, ভুটান এসব দেশ নিরাপদ। কিন্তু নিচু দেশগুলো ঝুঁকিতে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলো সবচেয়ে বিপদে। এসব দ্বীপ সমুদ্র থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচু। সমুদ্র বাড়লে এরা ডুবে যাবে। ইউরোপে নেদারল্যান্ডসের অনেক অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। তারা বাঁধ দিয়ে রক্ষা করছে।

পানি বৃদ্ধির কারণ কী

সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, পানির তাপীয় প্রসারণ। গরম হলে যেকোনো পদার্থ প্রসারিত হয়। পানিও এর ব্যতিক্রম নয়। সমুদ্রের পানি গরম হচ্ছে। এতে আয়তন বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, বরফ গলা পানি যুক্ত হচ্ছে। স্থলভাগের বরফ গললে সরাসরি সমুদ্রে পড়ে। এতে পানির পরিমাণ বাড়ে। এছাড়া মানুষের কিছু কাজ পরোক্ষভাবে দায়ী। ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পানি শেষে সমুদ্রে যায়। নদীতে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহ বদলে যাচ্ছে। বন কেটে জমি তৈরি করা হচ্ছে।

পানি বৃদ্ধির প্রধান উৎসসমূহ:

  • তাপীয় প্রসারণ: উষ্ণতা বৃদ্ধিতে পানির আয়তন বাড়ছে প্রায় ৩০ শতাংশ
  • হিমবাহ গলন: পাহাড়ি এলাকার বরফ গলে পানি যোগ হচ্ছে
  • গ্রিনল্যান্ড বরফ: প্রতি বছর বিলিয়ন টন বরফ গলছে
  • অ্যান্টার্কটিকা বরফ: দক্ষিণ মেরুর বরফ দ্রুত কমছে
  • ভূগর্ভস্থ পানি: মানুষ তুলে ব্যবহার করছে যা সমুদ্রে মিশছে

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তন সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিবছর বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ কমছে না। উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি কার্বন ছাড়ছে। কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে গরিব দেশগুলোর। এটা একটা বৈশ্বিক অন্যায়। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু সমুদ্র বাড়াচ্ছে না। আবহাওয়া আরও চরম হচ্ছে। খরা বেশি তীব্র হচ্ছে। বন্যা আরও ভয়াবহ হচ্ছে। ঝড় শক্তিশালী হচ্ছে। এসব দুর্যোগ একসাথে আঘাত করছে। উপকূলীয় মানুষ বহুমুখী বিপদে পড়ছে। তাদের মোকাবেলা করার সামর্থ্য কম।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার

বিজ্ঞানীরা বলছেন সমুদ্রের উচ্চতা প্রতি বছর প্রায় ৩.৩ মিলিমিটার বাড়ছে। শুনতে কম মনে হলেও এটা অনেক। গত শতাব্দীতে মোট ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। কিন্তু এই হার বাড়ছে। ১৯৯০ এর দশকে হার ছিল ২ মিলিমিটার। এখন তা ৩.৩ মিলিমিটার। আগামী দশকে আরও বাড়বে। ২১০০ সালের মধ্যে ১ থেকে ২ মিটার বাড়তে পারে। কিছু গবেষণায় আরও বেশি বলা হচ্ছে। যদি অ্যান্টার্কটিকার বরফ দ্রুত গলে তাহলে ৫ মিটারও বাড়তে পারে। এটা হবে মহাবিপর্যয়। লাখ লাখ বর্গকিলোমিটার ডুবে যাবে। কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।

সময়কালবার্ষিক বৃদ্ধির হারমোট বৃদ্ধি
১৯০০-২০০০১.৫ মিমি/বছর১৫ সেমি
২০০০-২০২৫৩.৩ মিমি/বছর৮ সেমি
২০২৫-২০৫০ (পূর্বাভাস)৪-৫ মিমি/বছর১০-১২ সেমি
২০৫০-২১০০ (পূর্বাভাস)৬-১০ মিমি/বছর৫০-১০০ সেমি

উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা

উপকূলের মানুষের জীবন সমুদ্রের সাথে জড়িত। তারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। লবণ তৈরি করে। চিংড়ি চাষ করে। কিন্তু সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ায় এসব কাজ কঠিন হচ্ছে। লবণাক্ত পানি মিঠা পানির উৎস নষ্ট করছে। পুকুর, কুয়া সব লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে পানীয় জলের সংকট তীব্র। মেয়েরা দূর থেকে পানি আনতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ বেশি হচ্ছে। শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। ঘরবাড়ি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। লবণ পানি দেওয়াল নষ্ট করছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রতিদিন ভয়ে থাকছে কখন ঝড় আসবে।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় এলাকা

উপকূলীয় এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকা সরাসরি সমুদ্রের কাছে। জোয়ারের পানি সহজে ঢুকতে পারে। ভাটার সময় পানি নামে। কিন্তু সমুদ্র বাড়লে জোয়ার আরও উঁচু হবে। ভাটায় পানি পুরো নামবে না। এতে সব সময় পানি জমে থাকবে। মানুষ চলাচল করতে পারবে না। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাবে। ম্যানগ্রোভ বন রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এসব বন ঝড়ের গতি কমায়। কিন্তু লবণাক্ত পানি বেশি হলে বনও মরে যায়। তখন আর কোনো সুরক্ষা থাকে না। বাঁধও সব সময় রক্ষা করতে পারে না।

উপকূলীয় এলাকার চ্যালেঞ্জসমূহ:

  • ভূমি ক্ষয়: প্রতি বছর হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যাচ্ছে
  • লবণাক্ততা: মাটি ও পানির গুণমান নষ্ট হচ্ছে দ্রুত
  • জীবিকা হুমকি: মাছ ধরা ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
  • অবকাঠামো ক্ষতি: রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ভেঙে পড়ছে
  • স্বাস্থ্য সমস্যা: পানিবাহিত রোগ বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে

ভবিষ্যতে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা কত বাড়তে পারে

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৮০ বছরে সমুদ্র ১ থেকে ২ মিটার বাড়তে পারে। এটা নির্ভর করে কার্বন নিঃসরণের উপর। যদি আমরা এখনই কার্বন কমাই তাহলে ক্ষতি কম হবে। না কমালে বেশি বাড়বে। কিছু চরম পরিস্থিতিতে ৫ মিটারও বাড়তে পারে। এতে বিশাল এলাকা ডুবে যাবে। পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যাবে। অনেক শহর পানির নিচে থাকবে। দেশের সীমানা পাল্টে যাবে। কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে। এই মানুষদের কোথায় রাখা হবে? কে দেখাশোনা করবে? এসব বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধের উপায়

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধের উপায় সম্পর্কিত সচেতনতা ছবি

এই সমস্যা সমাধান কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রথমত, কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি বেশি ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বনায়ন বাড়াতে হবে। বেশি গাছ লাগালে বেশি কার্বন শোষিত হবে। তৃতীয়ত, শিল্প কারখানায় পরিষ্কার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। চতুর্থত, যানবাহনে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, মানুষকে সচেতন করতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে সমাধান সম্ভব। সরকার, সংস্থা, ব্যক্তি সবার দায়িত্ব আছে।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ

বিশ্বের দেশগুলো একসাথে কাজ করছে। প্যারিস চুক্তিতে সব দেশ স্বাক্ষর করেছে। এতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন হয় প্রতি বছর। সেখানে দেশগুলো পরিকল্পনা করে। উন্নত দেশগুলো অনুন্নত দেশকে সাহায্য করছে। প্রযুক্তি দিচ্ছে, টাকা দিচ্ছে। কিন্তু এখনও যথেষ্ট নয়। আরও বেশি করতে হবে। সবাইকে প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। বড় দেশগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। তারা বেশি দূষণ করেছে। তাদের বেশি দায়িত্ব। ছোট দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। তাদের সাহায্য দরকার বেশি।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগসমূহ:

  • প্যারিস চুক্তি: তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক সহযোগিতা চলছে
  • জলবায়ু তহবিল: উন্নত দেশ অনুন্নত দেশকে আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে
  • প্রযুক্তি স্থানান্তর: পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি শেয়ার করা হচ্ছে
  • সবুজ শক্তি: নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে বিশ্বব্যাপী
  • গবেষণা সহযোগিতা: বিজ্ঞানীরা একসাথে কাজ করছেন

উপকূল রক্ষায় সাগর বাঁধের গুরুত্ব

সাগর বাঁধ উপকূলকে রক্ষা করে। এটা সমুদ্রের পানি আটকায়। ঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাস বাঁধে আটকে যায়। এতে গ্রাম রক্ষা পায়। বাংলাদেশে অনেক বাঁধ আছে। কিন্তু সব বাঁধ মজবুত নয়। অনেক বাঁধ পুরানো ও দুর্বল। এগুলো মেরামত করা দরকার। নতুন বাঁধ তৈরি করা দরকার। বাঁধের উচ্চতা বাড়াতে হবে। সমুদ্র বাড়ছে তাই বাঁধও উঁচু করতে হবে। নেদারল্যান্ডস এই কাজে অভিজ্ঞ। তাদের পুরো দেশই বাঁধ দিয়ে রক্ষিত। আমরা তাদের থেকে শিখতে পারি। তবে বাঁধই একমাত্র সমাধান নয়। প্রাকৃতিক সুরক্ষাও দরকার।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও কৃষির ক্ষতি

কৃষি ক্ষেত্রে এই সমস্যা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকছে। এতে মাটি নষ্ট হচ্ছে। ধান গাছ লবণ সহ্য করতে পারে না। ফসল মারা যাচ্ছে। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা ঋণের বোঝা বাড়ছে। অনেকে কৃষি ছেড়ে দিচ্ছে। শহরে চলে যাচ্ছে কাজের খোঁজে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমছে। দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করছেন। কিছু সফলতা এসেছে। কিন্তু সব জায়গায় তা কার্যকর নয়। সবজি চাষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলের বাগান নষ্ট হচ্ছে।

ফসললবণ সহনশীলতাউপকূলে চাষযোগ্যতা
ধানকমকঠিন হয়ে যাচ্ছে
গমখুব কমপ্রায় অসম্ভব
সবজিমাঝারিসীমিত
নারকেলবেশিসম্ভব

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাব

এই সমস্যার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল। প্রথমত, সম্পত্তির মূল্য কমছে। উপকূলের জমির দাম পড়ে যাচ্ছে। মানুষ বিক্রি করতে চাইলেও কিনছে না কেউ। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। রাস্তা, ব্রিজ, স্কুল সব ভেঙে পড়ছে। এগুলো মেরামত করতে অনেক টাকা লাগছে। তৃতীয়ত, কৃষি উৎপাদন কমছে। এতে আয় কমছে। চতুর্থত, মৎস্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পঞ্চমত, পর্যটন কমছে। সৈকত ছোট হয়ে যাওয়ায় পর্যটক কমছে। ষষ্ঠত, স্বাস্থ্য খরচ বাড়ছে। রোগব্যাধি বেশি হচ্ছে।

বন্যা ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্পর্ক

সমুদ্রের উচ্চতা বাড়া আর বন্যা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সমুদ্র উঁচু হলে নদীর পানি সহজে নামতে পারে না। পানি নদীতে জমে থাকে। এতে বন্যা হয়।বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও বাড়ে। নদীতে পানি বেশি থাকে। উপরে বৃষ্টির পানি আসছে। নিচে সমুদ্র বাধা দিচ্ছে। ফলে পানি উপচে পড়ে। উপকূলীয় এলাকায় জোয়ারের সময় বন্যা হয়। আগে জোয়ার শেষে পানি নেমে যেত। এখন নামে না পুরোপুরি। কিছু পানি থেকে যায়। পরের জোয়ারে আরও পানি যোগ হয়। এভাবে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। নিষ্কাশন ব্যবস্থা কাজ করছে না। কারণ সমুদ্র উঁচু হওয়ায় পানি বের হতে পারছে না।

বন্যা বৃদ্ধির কারণসমূহ:

  • নদীর জলস্তর বৃদ্ধি: সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিতে নদীর পানি জমছে
  • জোয়ারের প্রভাব: জোয়ারের পানি বেশি ভিতরে ঢুকছে
  • নিষ্কাশন সমস্যা: পানি বের হতে পারছে না সহজে
  • বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে
  • নদী ভাঙন: নদীর তীর ভেঙে পানি ছড়াচ্ছে

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বৈজ্ঞানিক মতামত

বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে একমত যে সমস্যা গুরুতর। তারা দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। স্যাটেলাইট থেকে সমুদ্রের উচ্চতা মাপা হচ্ছে। তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে প্রতিদিন। বরফ গলনের হার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সব তথ্য বলছে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, আমরা ইতিমধ্যে অনেক দেরি করে ফেলেছি। এখন শুধু ক্ষতি কমানো সম্ভব। সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব নয়। তবে আশা ছাড়া উচিত নয়। দ্রুত পদক্ষেপ নিলে অনেক ক্ষতি কমানো যাবে। প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। নতুন সমাধান আসছে।

উপসংহার

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এই যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এটি শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়। এটি মানবিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংকটও। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের উপকূলীয় এলাকায় লাখ লাখ মানুষ বসবাস করে। তাদের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে এই সমস্যার সমাধান আছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে দ্রুত। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। বনায়ন করতে হবে ব্যাপকভাবে। উপকূল রক্ষায় শক্তিশালী বাঁধ তৈরি করতে হবে। প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে। ম্যানগ্রোভ বন বাড়াতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। তারা বেশি দূষণ করেছে। তাদের বেশি সাহায্য করতে হবে। গরিব দেশগুলোকে প্রযুক্তি ও অর্থ দিতে হবে। জলবায়ু তহবিল বাড়াতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেক করার আছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা। গাছ লাগানো। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো। পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করা। এসব ছোট পদক্ষেপ মিলে বড় প্রভাব ফেলবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।

সময় কিন্তু ফুরিয়ে আসছে। প্রতিটি বছর গুরুত্বপূর্ণ। এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। দেরি করলে ক্ষতি অপূরণীয় হবে। আমাদের শিশুরা কেমন পৃথিবীতে বাঁচবে তা নির্ভর করছে আজকের কাজের উপর। তাই সবাই মিলে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন হতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে জীবনযাত্রায়। তবেই সম্ভব সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ করা। তবেই সম্ভব নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়া।

লেখকের নোট: এই নিবন্ধে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব, কারণ, ফলাফল এবং সমাধানের উপায় তুলে ধরা হয়েছে। সহজ ভাষায় লেখা এই নিবন্ধ সবার জন্য বোধগম্য। পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী(FAQs)

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ কী?

প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের পানি গরম হয়ে প্রসারিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মেরু অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার বরফ গলে সমুদ্রে পানি যুক্ত হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ এই দুটি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

বাংলাদেশে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব কী?

বাংলাদেশে এর প্রভাব মারাত্মক। উপকূলীয় এলাকা ডুবে যাচ্ছে। কৃষি জমিতে লবণ ঢুকছে। ফসল হচ্ছে না। পানীয় জলের সংকট বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি বাড়ছে। লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে প্রতি বছর।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা কত দ্রুত বাড়ছে?

বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩.৩ মিলিমিটার বাড়ছে। গত শতাব্দীতে মোট ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এই হার ক্রমাগত বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন ২১০০ সালের মধ্যে ১-২ মিটার বাড়তে পারে।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কি থামানো সম্ভব?

সম্পূর্ণ থামানো কঠিন তবে হার কমানো সম্ভব। কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। বনায়ন করতে হবে ব্যাপকভাবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে অনেক ক্ষতি এড়ানো যাবে।

বাংলাদেশের কোন এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিতে?

খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা এসব জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সুন্দরবন এলাকা, উপকূলীয় দ্বীপগুলো এবং চরাঞ্চল বিশেষভাবে বিপদে আছে। এসব এলাকা সমুদ্র থেকে খুব কম উঁচু।

উপকূল রক্ষায় কী করা যেতে পারে?

শক্তিশালী বাঁধ তৈরি করতে হবে। ম্যানগ্রোভ বন বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে। পরিকল্পিত বসতি স্থাপন করতে হবে। জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হবে।

লবণাক্ত পানি কৃষিতে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

লবণাক্ত পানি মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে। ধান গাছ লবণ সহ্য করতে পারে না। ফলে ফসল মারা যায়। জমি অনুর্বর হয়ে পড়ে। পানীয় জল দূষিত হয়। কৃষকরা ফসল ফলাতে পারে না। জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে।

গ্লোবাল ওয়ার্মিং কীভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ায়?

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পানি প্রসারিত হয়। এতে সমুদ্রের আয়তন বাড়ে। উষ্ণতা বরফ গলায়। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ দ্রুত গলছে। এই গলা পানি সমুদ্রে মিশছে। হিমবাহগুলোও গলে পানি যোগ করছে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কতটা এলাকা ডুবতে পারে?

গবেষণা বলছে ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭ শতাংশ এলাকা ডুবতে পারে। এতে প্রায় ৩ করোড় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি কার্বন নিঃসরণ না কমে তাহলে ক্ষতি আরও বেশি হবে। দক্ষিণাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমরা কী করতে পারি?

বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা। বেশি গাছ লাগানো। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো। পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করা। পানি অপচয় না করা। অন্যদের সচেতন করা। পরিবেশবান্ধব পণ্য কেনা। এসব ছোট কাজ বড় প্রভাব ফেলবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কি সম্পর্কিত?

হ্যাঁ, ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে বরফ গলছে এবং পানি প্রসারিত হচ্ছে। এই দুটিই সমুদ্রের উচ্চতা বাড়াচ্ছে। জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সমুদ্রের উচ্চতাও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করছে?

প্যারিস চুক্তিতে সব দেশ কাজ করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখার চেষ্টা চলছে। জলবায়ু তহবিল গঠিত হয়েছে। উন্নত দেশ অনুন্নত দেশকে সাহায্য করছে। প্রযুক্তি শেয়ার হচ্ছে। তবে আরও দ্রুত পদক্ষেপ দরকার।

বরফ গলন কি থামানো যাবে?

তাপমাত্রা বৃদ্ধি থামাতে পারলে বরফ গলনও কমবে। কিছু বরফ ইতিমধ্যে গলে গেছে। তা আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু আরও ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। দ্রুত কার্বন কমালে বরফ রক্ষা পাবে। মেরু অঞ্চল রক্ষা করা জরুরি।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কি বন্যা বাড়ায়?

অবশ্যই বাড়ায়। সমুদ্র উঁচু হলে নদীর পানি নামতে পারে না। এতে বন্যা হয়। জোয়ারের পানি বেশি ভিতরে ঢোকে। নিষ্কাশন ব্যবস্থা কাজ করে না। জলাবদ্ধতা বাড়ে। উপকূলীয় এলাকায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সুন্দরবন কি রক্ষা পাবে?

সুন্দরবন মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। লবণাক্ত পানি বৃদ্ধিতে গাছ মরছে। বাঘ ও হরিণের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। তবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে রক্ষা সম্ভব। ম্যানগ্রোভ বন বাড়াতে হবে। লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাঁধ মজবুত করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 🌍

Scroll to Top